ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় একে একে চারজনকে হত্যা: পুলিশ

0
রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আটককৃত দুই তরুণকে নিয়ে আসা হচ্ছে।। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দুই তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে উঠে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া এবং পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একে একে পরিবারের চার সদস্যকেই শ্বাসরোধে হত্যা করে তারা।

রোবাবার (২৩ আগস্ট ২০২৬) পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এবং অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রোববার বাড়ির সামনে স্থানীয়দের ভিড় ।। ছবি: সংগৃহীত

আটককৃত দুই তরুণ হলেন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)। তাঁরা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই এবং নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আশপাশের এলাকারই বাসিন্দা। আজ ভোররাতে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন এবং সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি জুয়েলারি দোকানে প্রায় আট বছর ধরে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।

ছাদে বাধা দেওয়া থেকে একে একে চার খুন

সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ পুরো ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও ঘাড়ে গামছা থাকা অবস্থায় খোলা ছাদে যান এবং তাঁদের ইয়াবা সেবনে বাধা দেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, “তিনি ওই দুজনকে চ্যালেঞ্জ করলে তারা স্যারের গলার গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন। তখন তিনি বাঁচার জন্য চেষ্টা করেন। এতে শব্দ হয়।”

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন, যেখানে শিক্ষকসহ চার সদস্যের চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় আটক দুই তরুণ ও উদ্ধারকৃত লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার প্রদর্শন করা হয়।। ছবি: সংগৃহীত

গণপতি চক্রবর্তীর চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ কমিশনার জানান, “এ সময় ওই দুজন সিঁড়িতে গামছা পেঁচিয়ে সিঁড়ির মধ্যেই তাকেও হত্যা করে।”

প্রীতিলতা চক্রবর্তীর আকুতি ও চিৎকার শুনে কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করা মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (প্রার্থী) এগিয়ে এলে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ কমিশনারের ভাষায়, “তাদের মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে আসলে ওই দুজন তাকেও রশি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করে।”

পরবর্তীতে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ঘরের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ১২ বছর বয়সী ছোট ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে (প্রিয়ম) শ্বাসরোধ করা হয়। পুলিশ কমিশনারের বর্ণনা অনুযায়ী, “এরপর প্রার্থীর ছোট ভাই ১২ বছর বয়েসি প্রিয়মকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিতে হত্যা করে ওই দুজন।”

হত্যাকাণ্ডের পর ৬-৭ ঘণ্টা অবস্থান ও শসা-খেজুর ভক্ষণ

হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর আসামিরা কোনো তাড়াহুড়ো না করে দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতেই অবস্থান করে। সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগরের ডিবি ডিসি সনাতন চক্রবর্তী জানান, ওই শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর তারা আরও ৬-৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতেই ছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। ডিবি ডিসি সনাতন চক্রবর্তী বলেন, “ভোর রাতে সন্দেহভাজন দুজনকে আটকের পর তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা অকপট খুনের কথা স্বীকার করেছে। আমরা তাদের একসাথে ও আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হয়েছি।”

বাড়িতে অবস্থানের সময়ের বিবরণ দিয়ে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, “ইয়াবা খাওয়ার আলামত পেয়েছি। খেজুরের বিচি পেয়েছি। ফ্রিজ থেকে বের করে শসা খেয়েছে তারও আলামত পেয়েছি। খুন শেষের পর তারা গোসল করে। আগুনে টেস্ট করা চুড়ি পেয়েছি। তখন মনে হয়েছে গোল্ডের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত থাকতে পারে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে আমরা আসামি গ্রেফতারে সমর্থ হয়েছি।”

তিনি আরও জানান, “এরপর ছোটো ছেলের বাথরুমে গিয়ে তারা গোসল করে। পরে তাদের ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর খায়। সেখানে ইয়াবা সেবন করে। এসব আলামত আমরা পেয়েছি। এরমধ্যে সকাল হওয়ার পর তারা বেরিয়ে যাবার সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। জিনিসপত্র লুট করে জুমার নামাজের সময় তারা বেরিয়ে যায়।”

আলামত নষ্ট ও ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা

বাড়ি থেকে বের হওয়ার পূর্বে হত্যার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে এবং পুলিশের তদন্ত বিভ্রান্ত করতে ডাকাতির নাটক সাজায় অভিযুক্তরা। তারা আলমারি ও ড্রয়ার চাবি দিয়ে খুলে জামাকাপড়সহ অন্যান্য জিনিসপত্র এলোমেলো করে ফেলে রাখে। পুলিশ কমিশনার জানান, “যাওয়ার সময় বাসার ভেতরের সবকিছু ওই দুজনই ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে যায়। বাসায় থাকা দুটি ফোন তারা ডিটারজেন্ট দিয়ে বালতিতে ভিজিয়ে রাখে।”

নিহত পরিবারের লুট করা স্বর্ণালংকার স্থানান্তরের বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, “কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা সেখানকার মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে যায়। পরে তাদের দেখানো মতে এগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।”

স্বজনদের বিলাপ ও তালা ভেঙে লাশ উদ্ধার

এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে পচন ধরা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তালা ভেঙে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) লাশ উদ্ধার করে। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৬ মিনিটে বোন ও ভাগনির সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল এবং রাত ২টা ৪০ মিনিটে একটি কল এলেও তিনি তা ধরতে পারেননি। শুক্রবার সারাদিন ও শনিবার মোবাইল বন্ধ পেয়ে রাতে তারা বাসায় গিয়ে প্রধান গেট বন্ধ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

রংপুরের কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় অবস্থিত সেই তিনতলা ভবন, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করে ৬-৭ ঘণ্টা অবস্থান করে ঘাতকেরা।। ছবি: সংগৃহীত

মামলা দায়ের ও বিচার দাবি

এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহত শিক্ষকের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আমার ভাই খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তার কোনো শত্রু ছিল না। এভাবে কেন তাকে খুন করা হবে। আমরা চাই সঠিক তদন্ত করে সত্যিটা বের করা হোক।”

মামলার বিষয়ে তিনি আরও যুক্ত করেন, “আমি খবর পেয়ে গ্রাম থেকে এসেছি। মামলা করেছি। আশা করি সঠিক তদন্ত করে তারা (পুলিশ) বের করবে কী হয়েছে।”

পুলিশ জানিয়েছে, জব্দকৃত তথ্য-প্রমাণ ও রক্তমাখা আলামতসহ ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এদিকে একই পরিবারের চার সদস্যকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার প্রতিবাদে এবং অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।