রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ একই পরিবারের চারজনকে নির্মম হত্যা, উদ্ধার পচাগলা লাশ

0
রংপুরে একসঙ্গে হত্যার শিকার হয়েছেন এক পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি ।। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার (২২ আগস্ট ২০২৬) দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে তাঁদের নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে পচাগলা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

মর্মান্তিক এই চার খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি এবং হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের।

নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, তাঁদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। নিহতদের মধ্যে মেয়ে আগামী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করেছিলেন এবং ছেলে আয়ুশ জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। অবসর জীবনের পাশাপাশি গণপতি চক্রবর্তী হোমিও চিকিৎসা দিতেন বলে জানা গেছে।

পুলিশ ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল মরদেহগুলো। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের ফাঁকে পড়ে ছিল শিশু আয়ুশের লাশ, যার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। সিঁড়িতে প্রীতিলতা ও আগামীর দড়ি প্যাঁচানো লাশ এবং তৃতীয় তলার ছাদে গণপতি চক্রবর্তীর গামছা প্যাঁচানো লাশ উদ্ধার করা হয়।

তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, “চারজনেরই মুখ কিছুটা ঝলসানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মুখে রাসায়নিক-জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।” তিনি আরও যুক্ত করেন, “হত্যাকারীরা ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে হত্যা করেছে নাকি ডাকাতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত দল কাজ করছে।”

স্বজনেরা জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৬ মিনিটের পর থেকে পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শনিবার রাতে প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বাসায় গিয়ে প্রধান ফটক বন্ধ দেখেন এবং পাশের ভবনের জানালা দিয়ে ঘরের জিনিসপত্র তছনছ অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।

স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী প্রশ্ন তোলেন, “কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের কোনো শত্রু নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই।”

স্বজন ও প্রতিবেশীদের একাংশ জানান, ঘরের তিনটি কক্ষের আলমারি ও ড্রয়ার চাবি দিয়ে খোলা অবস্থায় ছিল এবং জামাকাপড় ছড়ানো ছিল, তবে আলমারি বা ড্রয়ার ভাঙা হয়নি। ল্যাপটপ, টেলিভিশন ও মুঠোফোন দুর্বৃত্তরা নেয়নি। জনবহুল এলাকায় এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও পাশের বাড়ির কেউ কিছু টের না পাওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত চারজনের লাশ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।