ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবার কুরবানি ঈদ

0

ত্যাগের মহিমা নিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দেশে ঈদুল আজহা পালিত হবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ১৬ মাস পার হয়ে গেল করোনার নিত্যনতুন রূপান্তরিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে লড়াই করতে করতে। তার পরও সংক্রমণকে ঠেকানোর মতো উপায়, অবলম্বন এবং কৌশল এত দিনে মানুষের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র আমাদের হতাশ এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার মতোই। আসছে বহুল প্রতীক্ষিত কুরবানির ঈদ। মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের আর এক মহাআয়োজন তো বটেই। দেশি গরুর হাট বসা থেকে শুরু করে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আমদানি সবই এক অসহনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে পার করতে হবে। এবার বলা হচ্ছে, দেশি গরুই কুরবানির চাহিদা মেটাতে যথেষ্ঠ। তবে এরই মধ্যে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে পশু কেনাবেচা শুরু হয়েছে। সবার পক্ষে তেমন প্রযুক্তির বলয়ে যুক্ত হওয়া আসলে সম্ভব কি না, তাও বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু দ্বিতীয় কার্যক্রমে সরাসরি পশুর হাটে সম্পৃক্ত হওয়া এবং কুরবানি দেওয়া, মাংস গোছানো সবই করতে হবে আবাসিক এলাকায়। যা কতখানি স্বাস্থ্যবিধি নিয়মের আওতায় আসবে, সেটাও বলা মুশকিল। তার ওপর আমরা উৎসবপ্রিয় জাতি। উৎসবে, উদযাপনে, আয়োজনে আমরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানকেও সাড়ম্বরতায় ভরিয়ে তুলি। করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান আগের তুলনায় অনেকটা থমকে গেছে। সারা বিশ্ব করোনার বহুল সংক্রমণে নাজেহাল। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মহামারি এই ভাইরাসটি এখন সারা দেশে ভয়ংকরভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, শনাক্ত এবং মৃত্যুর হারও ঊর্ধ্বগতির পর্যায়ে। উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে পড়েছে এক অবাঞ্ছিত দুর্দশা। বাংলাদেশ অতিক্রম করছে এক দুঃসহ ক্রান্তিকাল। সীমিত আকারে বারবার বিধিনিষেধ দেওয়া হচ্ছে সেই এপ্রিল, মে এবং জুন মাস থেকে। সম্প্রতি ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ পার করল বাংলাদেশ। দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় ভারতীয় নতুন ভ্যারিয়েন্ট আশঙ্কাজনকভাবে ছড়ানোর যে অসহনীয় দাপট, তাতে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২০ সালের এপ্রিল-মে যথার্থ বিধিনিষেধের মধ্যেই ১ বৈশাখ, পবিত্র রমজান মাস এবং ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর পালিত হয় সীমিত আকারে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধিকে আমলে নিয়েই। কিন্তু ঈদের আয়োজনে শেকড়ের টানে গ্রামে ছুটে যাওয়ার করুণ দৃশ্যও হতাশ হওয়ার মতোই ছিল। প্রায় দেড় বছর ধরে করোনার সঙ্গে ক্রমাগত লড়াইয়ে মানুষ কেমন যেন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। এ বছরের এপ্রিল, মে ও জুন মাসে অনেক কিছু ছাড় দিয়ে যে স্থবিরতার নির্দেশনা আসে, তাতে স্বাস্থ্যবিধি মানা তো হয়ইনি বরং অযাচিতভাবে লঙ্ঘন করার চিত্র সত্যিই হতবাক হওয়ার মতো। আর তার দাম দিতে হচ্ছে সারা দেশের অসচেতন মানুষদের। নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে মানুষ যেন কেমন বেপরোয়া এবং অস্থির হয়ে উঠেছে। সময়টা তো একেবারে কমও নয়। আবার নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি ছুটে যাওয়াও ঈদের অপরিহার্য উৎসব আয়োজন। ১ জুলাই থেকে যে কঠোর বিধিতে সারা দেশকে আটকে দেওয়া হয়েছে সেখানে অনেকের দেশের বাড়ি চলে যাওয়ার দৃশ্য উঠে এসেছে। আর ৩ দিন পরেই পবিত্র কুরবানির ঈদ। ঈদের পরে ফিরে আসার যে অসহনীয় ঢল তাতে করোনার নতুন সংক্রমণ বয়ে নিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকবে। মানুষ যদি নিজের ভালোটা নিজেই বুঝতে পারে, সেটাই অপেক্ষাকৃত মঙ্গল। যেমন নিজের জন্য একইভাবে দেশের সার্বিক কল্যাণের পর্যায়কেও নিরাপত্তায় আগলে রাখে। তবে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতিতে শুধু যে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, তা কিন্তু নয়। পাশাপাশি চিকিৎসাসামগ্রীর যথার্থ ঘাটতিও চোখে পড়ার মতো। যা ঢাকা ছাড়া অন্যান্য বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা এবং গ্রামগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দৃষ্টিকটুভাবে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে করোনার অত্যধিক প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়াই শুধু নয়, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটও এক বিব্রতকর অবস্থায় চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয় সরবরাহ একেবারে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠিত হওয়ার মতো। আর আইসিইউর অতুলনীয় সংকটাপন্ন রোগীদের প্রাসঙ্গিক চিকিৎসাও ব্যাহত হওয়ার চিত্র সংশিষ্টদের বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়ে চলেছে। সারা দেশে যেভাবে করোনার চরম সংক্রমণ অতীতের রেকর্ডকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, সে মাত্রায় প্রাসঙ্গিক চিকিৎসার অভাবও অনেক দুর্ভাগ্য রোগীকে মরণের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যাইহোক স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা ময়দানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করার নির্দেশনা এরই মধ্যে দেওয়া আছে। সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থার শিকার হতে হবে পশুর হাটে। তা ছাড়া নতুন সংক্রমণে সয়লাব ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের অনুপ্রবেশের আশঙ্কায়। কারণ সীমান্ত যতই কঠোর অবস্থানে যাক ভারতীয় গরু আসাকে কীভাবে প্রতিরোধ করা হবে, সেটাও এক অনিশ্চয়তার বিষয়। গরু কেনা ছাড়াও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ করা এক সংকটময় ব্যাপার। এখানে লোকবল অবধারিত বিষয় বলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আমলে নেওয়াও অত সহজসাধ্য হবে না। কারণ মানুষ এখন অবধি তার নিজের সুরক্ষাকে খুব বেশি তোয়াক্কাও করছে না। তার ওপর ধর্মীয় উৎসব পালনের ক্ষেত্রে কতখানি সহনশীল এবং পরিমিত হবে, তাও দেখার অপেক্ষায় আমরা সবাই। এবার আমাদের মাঝে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঈদুল আজহা এসেছে। বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনাভাইরাসের থাবা। বাংলাদেশেও এ অদৃশ্য শত্রুর আক্রমণ। প্রতিদিনই আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অর্থনীতির অবস্থাও নাজুক। এতকিছুর পরও আমরা মনে করি, করোনাভাইরাস মহামারির সব অন্ধকার কাটিয়ে ঈদুল আজহা সবার মাঝে আনন্দ বয়ে আনবে।