বাজারে ভারতীয় ইলিশ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা

0
ছবি: লোকসমাজ।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সোমবার সকালে যশোর বড়বাজারের মাছপট্টির একটি দোকান থেকে ‘বরিশালের ইলিশ’ কিনে বাড়ি ফেরেন শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম। দুপুরে মাছটি রান্না করার পরই তার মনে সন্দেহ তৈরি হয়। স্বাদ ও গন্ধে যেন কেমন অচেনা!

বরিশালের ইলিশ মনে করে বেশি দাম দিয়ে কেনা মাছটি আসলে কোথা থেকে এসেছে-এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মঙ্গলবার বিকেলে বাজারে ফেরেন তিনি। সেখানে জানতে পারেন, ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশও যশোরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

শরিফুলের মতো এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন যশোরের অনেক ক্রেতা। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ছেন বিক্রেতারাও। কেউ দাবি করছেন, তারা ভারতীয় ইলিশকে ভারতীয় হিসেবেই বিক্রি করছেন। আবার ক্রেতাদের অভিযোগ, ‘বরিশালের ইলিশ’ পরিচয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে আমদানি করা মাছ।

বড়বাজারের মাছপট্টিতে মাছ কিনে প্রতারণার শিকার শরিফুল ইসলাম বলেন, “বরিশালের ইলিশ মনে করেই বেশি দাম দিয়ে মাছ কিনেছি। বাড়িতে নিয়ে রান্না করার পর স্বাদ ও গন্ধে অস্বাভাবিকতা পাই। পরে বাজারে এসে জানতে পারি, ভারত থেকেও ইলিশ আমদানি হয়েছে।”

একই অভিযোগ শামসুর রহমান নামে আরেক ক্রেতার। তার প্রশ্ন, মাছ ভারতীয় হলে ভারতীয় নামেই বিক্রি করা হোক। ‘বরিশালের ইলিশ’ পরিচয়ে বেশি দাম নেওয়া হবে কেন?

ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশ নিয়ে এমন পরিস্থিতি যশোরের বাজারে এবারই প্রথম তৈরি হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করা আমদানি করা ইলিশ দ্রুতই পৌঁছে যাচ্ছে যশোরের বড়বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে।

বাজারে সরেজমিনে দেখা যায়, বরফের ওপর সাজানো রয়েছে নানা আকারের ইলিশ। ক্রেতারা মাছ হাতে নিয়ে দেখছেন, পেট পরীক্ষা করছেন, ওজন ও দাম জেনে দরদাম করছেন। কিন্তু মাছের উৎস জানতে চাইলে কয়েকটি দোকানে বিক্রেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে—‘বরিশালের ইলিশ’।

বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দরে। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম কেজিতে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। ফলে মাছের উৎস সঠিকভাবে না জানলে ক্রেতাকে বেশি দাম গুনতে হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সন্দেহ।

তপন কুমার নামে আরেক ক্রেতা বলেন, যশোরের বাজারে প্রায় সব ইলিশই ‘বরিশালের ইলিশ’ নামে বিক্রি হচ্ছে। সেটি ভারত থেকে আসা হোক কিংবা সাগর থেকে ধরা হোক-পরিচয় দেওয়া হচ্ছে বরিশালের ইলিশ হিসেবে। তার মতে, নদীর ইলিশের চাহিদা ও দাম বেশি। স্বাদও ভালো হওয়ায় বরিশালের নদীর ইলিশ বলে বিক্রি করলে ক্রেতারা বেশি দাম দিতে রাজি হন।

তবে বিক্রেতাদের অনেকেই অভিযোগ অস্বীকার করছেন। মাছ বিক্রেতা পিয়ারু মোহাম্মাদ বলেন, ভারতীয় ইলিশকে বরিশালের ইলিশ বলে বিক্রি করার প্রশ্নই আসে না। ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশ বাজারে আসার পর থেকেই তাদের ক্রেতাদের এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।

ইলিশ ব্যবসায়ী এরশাদ আলী অবশ্য আমদানি করা ইলিশের সঙ্গে দেশি ইলিশের পার্থক্যের কথা স্বীকার করেন। তার ভাষ্য, গত কয়েক দিনে ভারত থেকে আসা ইলিশের চেহারা ও বৈশিষ্ট্যে কিছুটা তফাত রয়েছে। মাছগুলোর পেট বেশ মোটা এবং ডিমে ভরা। দেশি ইলিশের স্বাভাবিক স্বাদ ও সুগন্ধ এতে পাওয়া যায় না। তাঁর অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আমদানি করা এসব মাছকে দেশি ইলিশ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন।

অন্যদিকে বড়বাজারের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর শেখ বলেন, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবসায়িক সুনাম রক্ষায় এ ধরনের প্রতারণা থেকে দূরে থাকেন। ভারতীয় ইলিশকে ‘বরিশালের ইলিশ’ নামে বিক্রির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

যশোর জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়টি বাস্তব। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মোট আমদানি মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। আমদানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান।

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে এসব ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরে তা সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন বাজারে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় যশোরের বড়বাজারেও পৌঁছাচ্ছে আমদানি করা ইলিশ। এ বিষয়ে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, ঠিক কী কারণে ভারতীয় ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে, তা এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না।

ভারত থেকে আসা ইলিশের প্রকৃত উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দীন টিপু। তিনি বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি করা ইলিশ প্রকৃতপক্ষে ভারতের সমুদ্র থেকে আহরণ করা কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। ভারতের ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো দেশ থেকে ইলিশ আমদানি করে পরে বাংলাদেশে রপ্তানি করছেন কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়। তার মতে, এমনটি হলে তা বাংলাদেশের দেশীয় ইলিশের বাজারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বেনাপোল বন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন অফিসার সজীব সাহা জানান, দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। ১৯ জন আমদানিকারকের অনুকূলে আরও ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যেই এসব ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করবে বলে তিনি জানান।