ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত

0
কুবি শিক্ষকের ছেলে অপ্রতিম হত্যা মামলায় মূল আসামি সাইফুলসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার ও আইফোন উদ্ধারের বিষয়ে ব্রিফ করছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার।। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। মায়ের কাছ থেকে চেয়ে আনা আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত দুই কিশোরসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), সালমানপুর এলাকার ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর এবং হাতিগাড়া এলাকার ১৬ বছর বয়সী অপর এক কিশোর। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কারো আগের কোনো অপরাধের রেকর্ড (পিসিপিআর) নেই। এ ছাড়া ১৯ বছর বয়সী আরেক তরুণকে আটক করে ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। আজ রোববার দুপুরে কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান।

সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সাইফুলের সন্ধান:

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতীমের সঙ্গে দেখা যাওয়া সন্দেহভাজন কিশোর, যাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।। ছবি: সংগৃহীত

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাকে উদ্ধারে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন এলাকা ও কোটবাড়ির বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হয়। একটি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। পরবর্তীতে আশপাশের আরও একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বেলা আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে ওই কিশোর অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে।

পরে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় নিশ্চিত হওয়া যায় ওই কিশোরের নাম সাইফুল। গত শনিবার দুপুরে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে মাথায় আঘাতের চিহ্নসহ অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া মূল সন্দেহভাজন সাইফুলকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। সাইফুলকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো জায়গা অনুযায়ী তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত অপর দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্যে ঘটনার বিবরণ:

পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতিম শক্ত বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ফোন ছিনতাইয়ে ব্যর্থ হয়ে প্রথমে সাইফুল এবং পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গে থাকা ওই দুই কিশোর লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় সজোরে আঘাত করে।

একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে সাইফুল ফোনটি সাথে নিয়ে যায় এবং তিনজনই দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, এগুলো আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রাথমিক তথ্য এবং এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা ও এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন:

কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীম ।। ছবি: সংগৃহীত

সংবাদ সম্মেলনে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সাথে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা আছে কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, কুমিল্লায় এ পর্যন্ত ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সরাসরি কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িত কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় মাদকসেবী ও স্থানীয়দের আধিপত্য, লালমাই পাহাড়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের প্রাথমিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। জবাবে পুলিশ সুপার জানান, লালমাই পাহাড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি এবং অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একই সাথে তিনি সন্তানদের চলাফেরা, মেলামেশা এবং অল্প বয়সে ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম। পরিবারের ভাষ্য, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বের হয়ে সে আর ফেরেনি। অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের আবহ বিরাজ করছে।