জননেতা তরিকুল ইসলামের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

0

সাইফুর রহমান সাইফ॥ আজ ৪ নভেম্বর। দেশের রাজনীতির আকাশের ধ্রুব তারা, উন্নয়নের অগ্রপথিক ও ক্ষণজন্মা পুরুষ তরিকুল ইসলামের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের আজকের এদিনে রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন তিনি। অসংখ্য মানুষকে শোকসাগরে ভাসিয়ে চিরবিদায় নেন বর্ষিয়াণ এ রাজনীতিক। যার প্রমাণ মেলে পরদিন তার জানাজায় অগণিত মানুষের ঢল দেখে। যশোরের ঈদগাহে জানাজা হলেও তার ব্যাপ্তি প্রায় যশোর শহর জুড়ে ছড়িয়ে যায়।
যশোর উন্নয়নের যে কোন আলোচনায় যে রাজনীতিককে সর্বাগ্রে স্মরণ করেন জেলার মানুষ তিনি হচ্ছেন তরিকুল ইসলাম। যশোরের রাজনৈতিক সহাবস্থানের কান্ডারি হিসেবে সর্বাগ্রে বিবেচিত হন তিনি। তার রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় থেকেছে তখন উন্নয়নের যে ফল্গুধারা বয়েছে তা তাঁকে এনে দেয় যশোর উন্নয়ন কারিগরের সুখ্যাতি। জন্মভূমি যশোরের রাজনীতি, সংস্কৃতি, সামাজিকতা ও ক্রীড়াঙ্গণে তার দিপ্ত পদচারণা ছিল দলমত নির্বিশেষে। যশোরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা এমন মানুষের সংকট এ জেলার মানুষ অনুভব করেন পরতে পরতে।
তরিকুল ইসলাম ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন যশোর শহরে। তার পিতা আলহাজ আবদুল আজিজ ছিলেন যশোর শহরের একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। মা মোসাম্মৎ নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। পারিবারিক পরিবেশে বাল্যশিক্ষার মাধ্যমে পড়ালেখায় হাতেখড়ি হয় তাঁর। ১৯৫৩ সালে তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন যশোর জিলা স্কুলে। ১৯৬১ সালে জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৯৬৩ সালে এমএম কলেজ থেকে আইএ, ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ও ১৯৬৯ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালের কথা। তরিকুল ইসলাম তখন যশোর এমএম কলেজের শিক্ষার্থী। যশোর শহরের শহীদ মিনারটি ছিল ভাঙাচোরা। তরিকুল ইসলাম ও তার বন্ধু ও সহপাঠীরা একটি শহীদ মিনার তৈরি করেছিলেন। শহীদ মিনার তৈরির কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেফতার হন। কারাগারে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। কারাগারেই দীক্ষা নেন বাম রাজনীতির। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে যশোর এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। বৃহত্তর যশোর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গঠিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন এমএনএ আহম্মদ আলী সর্দারের দায়েরকৃত মিথ্যা মামলায় কিছুদিন কারাভোগ করেন এই ভাষা সৈনিক। ১৯৬৮ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য রাজবন্দী হিসেবে তিনি যশোর ও রাজশাহীতে কারাভোগ করেন নয় মাস। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় ফের গ্রেফতার হন বরেণ্য এই নেতা। পরে কমিউনিস্ট পার্টির নীতি-আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে না পেরে বেছে নেন নতুন পথ। ১৯৭০ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভাসানী আহূত ফারাক্কা লং মার্চেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কথা বলে যেমন কারাভোগ করেছেন, দেশ স্বাধীনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী হিসেবেও তাকে যেতে হয়েছে জেলে। ভাসানী ন্যাপ থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন বরেণ্য এ রাজনীতিক। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট প্রথম আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য তরিকুল ইসলাম। সেই সঙ্গে বিএনপির যশোর জেলা আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান ও ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ পান। আদর্শে আপোষহীন এ নেতা স্বৈরাচার এরশাদ আমলে গ্রেফতারের পর শিকার হন নিষ্ঠুর নির্যাতনের। তিনি কারাভোগের মাধ্যমে রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে মিথ্যা মামলা ও কারাভোগের শিকার হয়েছেন বারবার। যশোরে উদীচী হত্যা মামলা, অধুনালুপ্ত রানার পত্রিকার সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল হত্যাকা-সহ নানা মামলায় আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে তাঁর নাম রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়। ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের মতো গ্রেফতার হন তরিকুল ইসলামও। কারাভোগ করেন দীর্ঘ দেড় বছর। মহাজোট সরকারের আমলেও নতুন নতুন মামলার আসামি হয়ে গ্রেফতার ও কারাভোগ করেছেন। বিএনপিতে তার প্রভাব ও গুরুত্বের কারণে তিনি মামলা ও গ্রেফতারে বারবার লক্ষ্য হয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের।
১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তরিকুল ইসলাম নাম লেখান জনপ্রতিনিধির খাতায়। ১৯৭৮ সালে যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে যশোর সদর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত ও ১৯৮১ সালে সড়ক ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেও ভোটের রাজনীতিতে তাঁর ছিল মিশ্র অভিজ্ঞতা। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। পরের বছর হন পূর্ণমন্ত্রী। ১৯৯৪ সালে দায়িত্ব পান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পর্যায়ক্রমে খাদ্য, তথ্য ও সর্বশেষ বন ও পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। সবসময় তার জীবনযাত্রা ছিল খুবই সাধারণ। আগাগোড়াই গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত একজন নেতা। নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা যেমন, জাতীয় রাজনীতিতেও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। সার্বিকভাবে জনবান্ধব, সজ্জন একজন রাজনীতিক তিনি।
মা-মাটি-মানুষের সাথে তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। উন্নয়নের মাইল ফলক সৃষ্টি করেন তিনি। বিএনপি সরকারের আমলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর মেডিকেল কলেজ, যশোর কারিগরি প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ও করোনারি কেয়ার ইউনিট, বিভাগীয় কাস্টমস অফিস, বেনাপোল স্থল বন্দর, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, যশোর মডেল পৌরসভা, আঞ্চলিক পাঠাগার, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপনে। যশোরের শিক্ষা, সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সভাপতি ও উপদেষ্টা হিসেবে দশকের পর দশক দায়িত্ব পালন করেছেন। যার কারণে যশোরের মানুষ তাঁকে আধুনিক যশোরের রূপকার, যশোর উন্নয়নের কারিগরের স্বীকৃতি দেন। পারিবারিক জীবনে তরিকুল ইসলাম ছিলেন দুই ছেলের জনক। তার সহধর্মিণী অধ্যাপক নার্গিস বেগম যশোর সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে অবসরে যান। নার্গিস বেগম অবসরের যাওয়ার পর দৈনিক লোকসমাজের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নার্গিস বেগম বর্তমানে যশোর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। বড় ছেলে শান্তুনু ইসলাম সুমিত ব্যবসা করেন। বর্তমানে লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশক। ছোট ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রাজনীতিক। ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত অমিত বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক।
প্রসঙ্গত, বার্ধক্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন তরিকুল ইসলাম। তিনি আক্রান্ত হন ফুসফুসের ক্যান্সারে। এমনিতর এক পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর এই দিনে সকলকে কাঁদিযে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। তিনি যে কতবড় মহীরূহ ছিলের তার প্রমাণ মেলে তাঁর মৃত্যুর পর। লাখো মানুষের ঢল নামে তাঁর বাড়িসহ শহর জুড়ে। তাঁর নামাজে জানাজায় লাখ লাখ মানুষ ছিল যশোর ঈদগাহ ময়দানসহ শহর জুড়ে। যশোরের ইতিহাসে এমন জনসমুদ্রের জানাজা কেউ কখনও দেখেননি।