গুদামে সার, বাজারে সংকট বাড়তি দাম গুনছেন কৃষক

0
ছবি: এআই জেনারেট।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারি হিসাব বলছে, যশোরে সারের কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুতও রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ভরা মৌসুমে প্রয়োজনের সময় সার কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকেরা। কোথাও নির্ধারিত দামে সার মিলছে না, আবার কোথাও বাড়তি টাকা দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কৃষকদের দাবি, সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হচ্ছে। আর তদারকির ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।

বাঘারপাড়া উপজেলার শেখের বাতান গ্রামের কৃষক জোহর আলী জমিতে সার দেওয়ার জন্য স্থানীয় বাজারে গিয়ে দেখেন, চাহিদামতো সার থাকলেও তা সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না। ইউরিয়ার প্রতি বস্তায় তাকে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হয়েছে। অন্যান্য সারও কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

একই অভিযোগ করেছেন হাশিমপুর ও পাঁচবাড়িয়া গ্রামের কৃষকেরাও। কৃষক পল্লব হোসেন ও রেজাউল করিম বলেন, নির্ধারিত দামে সার চাইলে অনেক দোকানি ‘সার নেই’ বলে জানান। কিন্তু বাড়তি টাকা দিতে রাজি হলে একই দোকান থেকেই সার পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্য, বাজারে সরবরাহের ঘাটতি না থাকলেও কৌশলে সার আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা জানেন ভরা মৌসুমে কৃষকের সার লাগবেই। সেই বাধ্যবাধকতার সুযোগ নিয়েই নির্ধারিত মূল্যের বাইরে টাকা আদায় করা হচ্ছে। ফলে বিকল্প না থাকায় বাড়তি দাম দিয়েই সার কিনতে হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইউরিয়া ও টিএসপি সার কেজিপ্রতি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা দরে বিক্রির কথা। কিন্তু কৃষকদের দাবি, খুচরা বাজারে এসব দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কারণে প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। বীজ, শ্রমিক, সেচ ও কীটনাশকের বাড়তি খরচের সঙ্গে এই চাপ কৃষকের লাভের হিসাবকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

তবে ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করছেন না। হাশিমপুর বাজারের সাব-ডিলার আব্দুল মতিন বলেন, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করেন। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে সার দোকানে আনতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তার দাবি, পরিবহনসহ এক বস্তা সারের খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৩৪৯ টাকা। কৃষক পর্যায়ে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি করলে লাভ থাকে না বললেই চলে।

কৃষকদের প্রশ্ন, পরিবহন ব্যয়ের দায় কেন তাদের ওপর চাপানো হবে? সরকার নির্ধারিত মূল্য যদি কার্যকর থাকে, তাহলে অতিরিক্ত খরচের সমন্বয় কীভাবে হবে-সেই বিষয়েও তারা স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান।

অন্যদিকে কৃষি বিভাগের দাবি, যশোরে সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আবুল হাসান বলেন, জেলায় চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। কোথাও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া বা সার না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় ৭ হাজার ৮২২ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ১ হাজার ৩৮২ মেট্রিক টন টিএসপি, ৩ হাজার ৮১৯ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ২ হাজার ১৬৬ মেট্রিক টন এমওপি সার মজুত রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু কৃষকেরা যদি নির্ধারিত দামে সার না পান, তাহলে প্রশ্ন ওঠে-সমস্যা কোথায়? সরবরাহ শৃঙ্খলের কোনো স্তরে অনিয়ম হচ্ছে কি না, কিংবা চাহিদার সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষকদের মতে, শুধু গুদামে সার মজুত আছে কি না তা দেখলেই হবে না। ডিলার, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। কে কত সার পেলেন, কোথায় সরবরাহ করলেন এবং কত দামে বিক্রি হলো-এসব তথ্য নিয়মিত যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে সরকার নির্ধারিত মূল্যতালিকা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন এবং সেই দামে বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সরকারি হিসাবে সারের পর্যাপ্ত মজুত, ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয়ের যুক্তি এবং কৃষকদের অতিরিক্ত দাম দেওয়ার অভিযোগ-এই তিন বাস্তবতার মাঝখানে এখন বড় প্রশ্ন একটাই: যশোরে সারের বাজারে কি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে কার্যকর তদারকি ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।