ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী যশোরের প্রাচীন দেওয়ানী আদালত ভবন

দেড়শ বছরের পুরনো স্থাপনায় আবারও ফিরতে যাচ্ছে বিচারিক কার্যক্রম

0

শিকদার খালিদ, লোকসমাজ :
দেড়শ বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী দেওয়ানী আদালত ভবন। ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এই ভবন কেবল একটি আদালত ভবন নয়, বরং যশোর অঞ্চলের প্রশাসনিক, বিচারিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
ঐতিহাসিক সূত্র মতে, উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ প্রশাসন যশোরে বিচারিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে প্রায় ১৬ দশমিক ৩৪ শতক জমির ওপর এই দেওয়ানী আদালত ভবন নির্মাণ করে। সে সময়কার ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্যশৈলী অনুসরণে নির্মিত ভবনটিতে ছিল প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা। ভবনের নিচে ১৬টি ভেন্টিলেটর এবং উঁচু দেয়ালজুড়ে প্রশস্ত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা থাকায় গরমকালেও ভবনের অভ্যন্তর ছিল তুলনামূলক শীতল ও আরামদায়ক। চারপাশজুড়ে প্রশস্ত বারান্দা ভবনটিকে দিয়েছে আলাদা নান্দনিকতা।
স্থাপত্যবিদদের মতে, ভবনটির নির্মাণশৈলীতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আদালত স্থাপনার বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মোটা দেয়াল, উঁচু ছাদ, খিলানাকৃতির দরজা ও দীর্ঘ বারান্দা ভবনটিকে শুধু শৈল্পিক নয়, পরিবেশবান্ধব স্থাপনাতেও পরিণত করেছে।
দীর্ঘ সময় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির অবস্থা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণে সমস্যা সৃষ্টি হয়। বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনাও হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। একপর্যায়ে নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০১২ সালে ভবনটিতে বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এরপর থেকেই যশোরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকরা ভবনটি রক্ষার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তারা যশোর কালেক্টরেট ভবন, জেলা পরিষদ ভবন ও প্রাচীন দেওয়ানী আদালত ভবনকে জেলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের দাবি তোলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যশোরের মতো প্রাচীন জনপদের ইতিহাস সংরক্ষণে এসব ভবনের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এসব স্থাপনা শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়, বরং একটি সময়ের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, বিচারব্যবস্থা ও নগর বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে।
ইতোমধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন মন্ত্রণালয় ঐতিহ্যবাহী এই দেওয়ানী আদালত ভবন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সংস্কার কাজ সম্পন্ন হলে বহুদিন পর আবারও ঐতিহাসিক এই ভবনে বিচারিক কার্যক্রম চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যশোরবাসীর প্রত্যাশা, আধুনিকতার পাশাপাশি ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে এই উদ্যোগ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যশোরের বিচারিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে টিকে থাকবে দেড়শ বছরের পুরনো এই দেওয়ানী আদালত ভবন।