আমনের ভরা মৌসুমে ইউরিয়ার দাম বৃদ্ধি কৃষকের দুর্দিনে ব্যবসায়ীদের সুসময়

0

 

সাইফুর রহমান সাইফ ॥ আমন ফসল রোপণের এখন ভরা মৌসুম চলছে। এ সময়ে সরকার হঠাৎ করে বাড়িয়ে দিয়েছে অতি জরুরি ইউরিয়া সারের দাম। এমনিতে আষাঢ় ও শ্রাবণের বড় সময় জুড়ে প্রায় দেখা মেলেনি বৃষ্টির। তাতে অতিরিক্ত খরচে সেচ দিয়ে কৃষককে আমন রোপণ করতে হয়েছে। এ সময়ে সারের দাম বেড়ে কৃষকের যেন ত্রাহি অবস্থা।
ইউরিয়া সারের দাম বাড়ার কারণে কৃষকের যখন দুর্দিন চলছে তখন সার ব্যবসায়ীদের হয়েছে পোয়া বারো। তারা এক লাফে বিনা মেঘে বর্জ্যপাতের মতো অনেক টাকার মালিক বনে গেছেন। কারণ দাম বাড়ার আগেই ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইউরিয়া মজুত ছিল। এ মজুতের ওপর প্রতি কেজিতে তারা কমপক্ষে ৬ টাকা লাভ করছেন। আর কৃষক এ বাড়তি টাকা গচ্ছা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে কোন কোন স্থানে সরকার নির্ধারিত বর্ধিত ২২ টাকা কেজির ইউরিয়া ২৫ থেকে ২৭ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। এরআগে এ সারের কেজি প্রতি দাম কৃষক পর্যায়ে ছিল ১৬ টাকা। ১ আগস্ট থেকে তা বেড়ে হয়েছে ২২ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোরের উপপরিচালক মঞ্জুরুল হক দৈনিক লোকসমাজকে বলেন, আমন ফসলের জন্যে ইউরিয়াসহ টিএসপি, এমওপি, ডিএপি প্রভৃতি সার লাগে। সবচেয়ে বেশি লাগে ইউরিয়া।
তিনি জানান, প্রতি বিঘায় সর্বোচ্চ ১৫ কেজি সার তিনবারে আমন ফসলে দিতে হয়।
যশোরের অভয়নগর উপজেলার গোয়াখোলা গ্রামের কৃষক মীর অলিয়ার রহমানও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোরের উপপরিচালক মঞ্জুরুল হকের কথার সাথে আমন ফসলে সার প্রয়োগের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। বলেন, ইউরিয়ার দাম বেড়ে যাওয়াতে কৃষকের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কারণ ফলন বাড়াতে ইউরিয়া বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া এ বছর এমনিতে খরচ বেড়েছে সেচ দিয়ে আমন ধান রোপণ করতে গিয়ে। এখন যারা তা রোপণ করবেন তারা বৃষ্টির সুফল পাবেন।
তিনি জানান, নওয়াপাড়া কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া ২৫ থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে ব্যয় আরো বাড়ছে। এছাড়া আছে দিনমজুরের খরচ।
কেশবপুরের শেখপুরার মুফতি তাহেরুজ্জামান দৈনিক লোকসমাজকে বলেন, এত খরচ করে আর পারছি না। সরকার আমাদের দিকে একটু তাকালে ভাল হতো।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শাহ জালাল হোসেন দৈনিক লোকসমাজকে বলেন, নওয়াপাড়া কেন্দ্রিক ২০০’র মতো সার ব্যবসায়ী আছেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা করেন। এছাড়া অভয়নগর উপজেলায় ১৩জন সরকারি ডিলার আছেন। তাদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে। তবে কী পরিমাণ তা তিনি বলেন নি।
সূত্র জানিয়েছে, এ মজুতের পরিমাণ কম নয়। ইউরিয়ার দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কেজি সারে ব্যবসায়ীরা কমপক্ষে ৬ টাকা লাভ করে নিয়েছেন জমানো সারে। এতে ইউরিয়ার ডিলাররা একবারেই মোটা টাকা আয় করেছেন।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শাহ জালাল হোসেন আরো জানান, কৃষক পর্যায়ে প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১১০০ টাকা। অর্থাৎ ডিলারের কমিশন বাদে কৃষক পযায়ে প্রতি বস্তায় বেড়েছে ৩০০ টাকা।
এ হিসেবে যাদের কাছে ইউরিয়া মজুত আছে সেসব ব্যবসায়ী প্রতি বস্তায় এরি ভেতর লাভ করেছেন কমপক্ষে ৩০০ টাকা। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সার ডিলাররা দাম বাড়ানোর সুযোগে কাড়ি কাড়ি টাকা পকেটে ভরেছেন।
যশোর বাফার গোডাউন সূত্র জানায়, তাদের অধীনে ১৪২জন সরকারি সার ডিলার আছেন। চলতি আগস্ট মাসে ৯,৭৪৫ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে তাদের কাছে ইউরিয়া মজুত আছে ১১,৯৫৭ মেট্রিক টন। এ সার ২০টাকা দরে কিনে তা কৃষক পর্যায়ে ২২ টাকা দরে বিক্রি করতে হবে।
কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, সব ডিলার এ নির্দেশনা মানছেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোরের উপপরিচালক মঞ্জুরুল হক দৈনিক লোকসমাজকে আরো জানান, যশোরে এবার আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ১লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর জমি। এরিমধ্যে ১৮ হাজার হেক্টরে চাষ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি যা আছে তা ১৫ আগস্টের ভেতর রোপণ হবে।
তিনি জানান, ৩১ জুলাই পর্যন্ত যশোরে ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়া মঙ্গলবার ও বুধবার পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। আরো বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার বাকিটুকু পূরণ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শাহ জালালের মতে, এখনো ইউরিয়া বিক্রি সেভাবে শুরু হয়নি। ১৫ আগস্টের পর তা পুরোদমে শুরু হবে। দাম বাড়ার কারণে কৃষককে ইউরিয়ার বিকল্প ভাবতে হবে।