বিশেষ প্রতিনিধি, লোকসমাজ : নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ সুদ এবং ফ্ল্যাটের ক্রেতা সংকটে গভীর চাপে পড়েছে দেশের আবাসন খাত। নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা বাড়ছে, থমকে যাচ্ছে চলমান নির্মাণকাজ। ব্যয় সামলাতে কর্মী ছাঁটাই করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এতে আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আবাসন খাতকে সচল করতে গ্রাহকপর্যায়ে গৃহঋণের সুদ ৫ শতাংশে নামানো, আবাসন ব্যবসায়ীদের এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়া, ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল।
তাঁর আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজাল আবাসন খাতের বর্তমান সংকট, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য আবাসন সহজলভ্য করার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।
তাঁর মতে, আবাসনকে শুধু ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
আবাসন খাতের সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি।
রিহ্যাব সভাপতির দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে একপর্যায়ে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও ১২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। তাঁর হিসাবে, নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
অথচ নির্মাণব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান।
ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ক্রেতারা সাধারণত কয়েক বছর আগে ফ্ল্যাট কেনার চুক্তি করেন এবং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করেন। চুক্তির পর নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়লেও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকে।
এতে বাড়তি নির্মাণব্যয়ের পুরো চাপ বহন করতে হচ্ছে আবাসন ব্যবসায়ীদের।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে দীর্ঘদিন এ চাপ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসন খাতকে আরও সংকটে ফেলেছে ফ্ল্যাটের ক্রেতা কমে যাওয়া।
রিহ্যাব সভাপতির মতে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, গৃহঋণের উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা ফ্ল্যাট বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, মানুষের ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি। বরং বর্তমান বাজারদরে ফ্ল্যাট কেনা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকায় অনেকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছেন।
ড. আলী আফজালের ভাষ্য অনুযায়ী, করোনাকাল থেকে আবাসন খাতে সংকট বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও প্রভাবিত করেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগ করা অর্থ ও অর্জিত মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
আবাসন খাতের মন্দার প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানেও।
ড. আলী আফজালের দাবি, দেশের আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। নির্মাণকাজ কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন প্রকল্প বন্ধ হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীসংখ্যা কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত কতজন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই।
আবাসন খাতের সংকট শুধু ফ্ল্যাট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রড, সিমেন্ট, সিরামিক, আসবাবসহ প্রায় ২৭০টি সংযুক্ত শিল্পের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে বলে জানান রিহ্যাব সভাপতি।
তিনি বলেন, নির্মাণকাজ কমে গেলে এসব শিল্পের পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি কমে যায়। এতে উৎপাদন সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ পরিশোধেও চাপ তৈরি হয়।
ফলে আবাসন খাতের মন্দা পর্যায়ক্রমে বৃহত্তর অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়কেও বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন রিহ্যাব সভাপতি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর ও ফি মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
ফ্ল্যাটের মূল দামের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হওয়ায় অনেক ক্রেতার জন্য বাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ড. আলী আফজাল বলেন, নিবন্ধন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা ফ্ল্যাট কেনার পরও নিবন্ধন পিছিয়ে দেন।
নিবন্ধন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা গেলে ক্রেতারা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে
মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি।
তাঁর মতে, ঋণের সুদ কমানো গেলে সাধারণ মানুষের ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য বাড়বে। একই সঙ্গে আবাসন খাতে নতুন চাহিদা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় গৃহঋণের সুদহার নির্ধারণ করা যেতে পারে।
ঢাকায় তুলনামূলক বেশি সুদ, জেলা শহরে কম সুদ এবং উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
পাশাপাশি আবাসন ব্যবসায়ীদের এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ পেলে প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান প্রকল্প শেষ করার পাশাপাশি নতুন প্রকল্প গ্রহণেও উৎসাহিত হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ড. আলী আফজাল।
তিনি বলেন, নতুন আবাসন প্রকল্পের জন্য নির্বিচারে কৃষিজমি ব্যবহার না করে অব্যবহৃত সরকারি জমিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
সরকারি জমির সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও দক্ষতা যুক্ত করা গেলে তুলনামূলক কম খরচে আবাসন নির্মাণ সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ঢাকাকেন্দ্রিক আবাসন পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
রাজধানীর আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে ঢাকায় যাতায়াত সহজ করতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন রিহ্যাব সভাপতি।
তাঁর মতে, কর্মস্থলে যাতায়াতের সুবিধা বাড়লে ঢাকার বাইরে বসবাসের আগ্রহ বাড়বে। এতে রাজধানীর আবাসন চাহিদার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার দাবিও জানিয়েছেন ড. আলী আফজাল।
জমি ও ভবনের নকশা অনুমোদনসহ সরকারি সেবাগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় লাগে।
এতে নির্মাণব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের চাপও পড়ে ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের ওপর।
তিনি মনে করেন, সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে আবাসন খাতের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত হবে।
আবাসন খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন রিহ্যাব সভাপতি।
তাঁর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশেষ করে এসব সুবিধা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ড. আলী আফজাল বলেন, নির্মাণব্যয়, গৃহঋণের সুদ এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয়—এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আবাসন খাতে নতুন গতি সঞ্চার সম্ভব।
পাশাপাশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবায় দীর্ঘসূত্রতা দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রিহ্যাব সভাপতির মতে, পরিকল্পিত নীতিসহায়তা ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের মাধ্যমে আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে ফ্ল্যাটের বাজারে চাহিদা বাড়বে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।





