সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে চাপে আরএসএস, পশ্চিমা বিশ্বে ইমেজ রক্ষার তৎপরতা

আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপে ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের

0

লোকসমাজ ডেস্ক : ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে তৎপরতা বাড়িয়েছে। সংগঠনটি বলছে, তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার যে অভিযোগ রয়েছে, তা ‘ভুল ধারণা’ ও ‘অপপ্রচার’; এসব দূর করতেই বিদেশ সফরের আয়োজন করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় আরএসএস এখন ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ কৌশল নিয়েছে।

কী এই আরএসএস?

১৯২৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে চিকিৎসক ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী কেশব বালিরাম হেডগেওয়ার প্রতিষ্ঠা করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস। সংগঠনটি নিজেদের “হিন্দু-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাভিত্তিক আন্দোলন” হিসেবে পরিচয় দিলেও সমালোচকরা একে হিন্দুত্ববাদী ও উগ্র ডানপন্থী সংগঠন হিসেবে দেখেন।

আরএসএসের লক্ষ্য ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে হিন্দুরাষ্ট্রে রূপান্তর করা—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সংগঠনটি স্কুল, হাসপাতাল, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের নানা স্তরে কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং “সংঘ পরিবার” নামে পরিচিত ২,৫০০-এর বেশি সংগঠনের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক অপূর্বানন্দ আল জাজিরাকে বলেন, আরএসএসের প্রাথমিক আদর্শে ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনি ও জার্মান নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের প্রভাব ছিল স্পষ্ট।

তিনি বলেন, “আরএসএসের প্রথম দিককার লেখাগুলোতে হিটলারের নীতির প্রতি প্রশংসা দেখা যায়। মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিষয়ে তারা একই ধরনের নীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিল।”

ভারতে মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৪৮ সালে আরএসএসকে নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। হত্যাকারী নাথুরাম গডসে একসময় সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক

আরএসএসকে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৯৭২ সালে আরএসএসে যোগ দেন এবং পরে বিজেপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে আরএসএসের সাংগঠনিক শক্তি ও আদর্শিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের ভোপালে আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকদের শোভাযাত্রার সময় ভারতীয় মুসলিমরা তাদের ওপর ফুলের পাপড়ি ছুঁড়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন।
২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের ভোপালে আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকদের শোভাযাত্রার সময় ভারতীয় মুসলিমরা তাদের ওপর ফুলের পাপড়ি ছুঁড়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন।

বাড়ছে কি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ?

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক বক্তব্যের ঘটনা ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগই বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে ঘটেছে।

২০১৫ সালের পর থেকে গরু জবাই বা গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে ভারতে একাধিক মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে খ্রিস্টানদের উপাসনালয় ও প্রার্থনা সভায় হামলার ঘটনাও বেড়েছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, বিজেপি ও আরএসএসের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কারণে এসব ঘটনা বাড়ছে। যদিও সংগঠন দুটি এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

পশ্চিমা বিশ্বে কী করছে আরএসএস?

আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে বিরল এক ব্রিফিংয়ে জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আরএসএসকে ‘প্যারামিলিটারি’ সংগঠন এবং ‘হিন্দু আধিপত্যবাদী’ গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।”

নয়াদিল্লিতে বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে
নয়াদিল্লিতে বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে

এপ্রিল মাসে তিনি যুক্তরাজ্যে চ্যাথাম হাউস, রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং হাডসন ইনস্টিটিউটের মতো রক্ষণশীল থিংক ট্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেন।

এরপর তিনি জার্মানিতেও বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বিশ্লেষক অপূর্বানন্দের মতে, পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসকারী হিন্দু প্রবাসীদের আর্থিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক ডানপন্থী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায় আরএসএস।

কেন এই তৎপরতা?

গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (USCIRF) এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করে, আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত।

প্রতিবেদনে সংগঠনটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশও করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই সুপারিশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে বিদেশে জনসংযোগ কার্যক্রম জোরদার করেছে আরএসএস।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইটের নির্বাহী পরিচালক রাকিব হামিদ নাঈক বলেন, “নিষেধাজ্ঞার আলোচনা জোরালো হওয়ায় আরএসএস এখন নিজেদের পক্ষে পাল্টা বয়ান দাঁড় করাতে চাইছে।”

তার মতে, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে সংগঠনটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও অর্থায়নে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।