স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ : উৎসবের উল্লাসে নেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

0
স্বাগত ১৪৩৩
উৎসবের উল্লাসে নেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

শিকদার খালিদ।লোকসমাজ

বাংলাদেশের সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের একমাত্র উৎসব বাংলা নববর্ষ আজ। ভোর সকাল থেকে নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার মানুষ। শোভাযাত্রা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভিতর দিয়ে উৎসব-উচ্ছ্বাসে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসে . . .’ গেয়ে আহবান জানানো হবে নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে।
পহেলা বৈশাখ এলেই দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। রঙিন শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নতুন পোশাক আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে শহর। বাংলা নববর্ষ এখন নিঃসন্দেহে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। কিন্তু এই উল্লাসের মাঝেই একটি মৌলিক প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়-এই দিনটি কি কেবল উৎসবের জন্য, নাকি এটি আমাদের জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নতুন পরিকল্পনার সূচনার দিন হওয়ার কথা ছিল?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলা নববর্ষের উৎপত্তি উৎসবকেন্দ্রিক নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে। মোগল সম্রাট আকবর কৃষি উৎপাদন ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে হিজরি ও সৌর সনের সমন্বয়ে যে বর্ষপঞ্জি চালু করেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল ফসল তোলা ও খাজনা আদায়ের সময়কে একসূত্রে আনা। অর্থাৎ, বাংলা সনের শুরুটাই ছিল হিসাব-নিকেশ ও নতুন পরিকল্পনার সময়।

স্বাগত ১৪৩৩-লোকসমাজএকইভাবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে “হালখাতা” ছিল নতুন বছরের অর্থনৈতিক সূচনার প্রতীক। পুরোনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন খাতা খোলা—এটি শুধু একটি প্রথা নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক সংস্কৃতি।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই অর্থবোধক ঐতিহ্য প্রায় বিলীন। বাংলা নববর্ষ এখন মূলত শহরকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। গ্রামবাংলার কৃষকের জীবনে এর যে বাস্তব গুরুত্ব ছিল, তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। মাঠে ফসলের পরিকল্পনার চেয়ে এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শোভাযাত্রার আয়োজন।
এই পরিবর্তন কেবল সাংস্কৃতিক নয়-এটি আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন।
কারণ, একদিকে আমরা নববর্ষকে জাতীয় উৎসব হিসেবে উদযাপন করছি, অন্যদিকে দেশের কৃষি খাত—যা এখনো অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি—পরিকল্পনার অভাবে বারবার সংকটে পড়ছে। কৃষক এখনও বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী চাষাবাদ করেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেই বর্ষপঞ্জিকে ভিত্তি করে কোনো সমন্বিত কৃষি পরিকল্পনা নেই।
প্রতিবছর একই সমস্যা ফিরে আসে- সার ও কীটনাশকের সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারে মূল্য অস্থিরতা। মাছ চাষে পোনা ও খাদ্যের ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৌসুমি অনিশ্চয়তা—এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর নীতি চোখে পড়ে না।
অথচ দেশে কৃষি উন্নয়নের জন্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কৃষকের কাছে তাদের কার্যকারিতা সীমিত। কৃষি বিপণন ব্যবস্থাও দুর্বল—সংকটকালে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে, আর সংকট কেটে গেলে সেই আমদানিই স্থানীয় কৃষকের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ অবস্থায় বাংলা নববর্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সময় হতে পারত। বছরের শুরুতেই কৃষিভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন, উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল—এসব নির্ধারণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যেত।
কিন্তু আমরা সেটিকে সীমাবদ্ধ রেখেছি উৎসবে।
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলা নববর্ষ আজ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি জাতীয় উৎসব। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐক্যের শক্তিশালী প্রতীক। কিন্তু সংস্কৃতি যদি বাস্তব জীবনের প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
তাই এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
বাংলা নববর্ষকে শুধুমাত্র উৎসব হিসেবে নয়, বরং একটি কার্যকর জাতীয় সূচনাবিন্দু হিসেবে ভাবতে হবে। কৃষি, উৎপাদন ও বাজারকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত বাৎসরিক পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ হিসেবে পহেলা বৈশাখকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
নচেৎ, আমরা প্রতি বছর নববর্ষ উদযাপন করব-কিন্তু নতুন করে কিছু শুরু করতে পারব না।