বাঙালিত্বের বহিঃপ্রকাশ দিনমান, প্রাণের উচ্ছ্বাসে বর্ষবরণ যশোরে

0

নিজস্ব প্রতিবেদক।লোকসমাজ –

বাংলা বছরের প্রথম দিনটি বর্ষবরণের আয়োজন যেন জাতির হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রতি বছরের পহেলা বৈশাখ। সরকারি-বেসরকারি সকল উদ্যোগে বাঙালিত্ব প্রকাশের এক উৎসবে শামিল হন সকলে। তার ব্যত্যয় হয়নি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের শুভাগণের দিন মঙ্গলবার।
পহেলা বৈশাখের আয়োজনে যশোরের সুখ্যাতি দেশব্যাপী। বর্ষবরণ শোভাযাত্রার সুতীকাগার এ সংস্কৃতির পীঠস্থানের মানুষগুলো দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকেন। যে যেখানে থাকেন ফিরে আসেন মাটির টানে। যেমন এবারের পহেলা বৈশাখে ঠিকই শত ব্যস্ততার মধ্যেও রাজধানী ছেড়ে যশোরে চলে এসেছেন সংসদ সদস্য, বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। জেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানসহ একাধিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোর জেলা প্রশাসনের নববর্ষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন – লোকসমাজ

মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের দিন ভোর সকাল থেকেই নববর্ষকে বরণ করতে যশোরবাসী বেরিয়ে আসেন ঘরের বাইরে। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো . . .’ সুরে সমবেত কণ্ঠ মিলিয়ে তারা শামিল হল উৎসবে। উৎসবের অন্যতম অনুসঙ্গ শোভাযাত্রায় ঐতিহ্যের চারুপীঠসহ ৫০টির বেশি সংগঠন গত দুই মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। সকাল সাড়ে সকল সংগঠন সমবেত হয় টাউন হল মাঠে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখান থেকে সকলের এক সাথে শোভাযাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু শোভাযাত্রা বের হওয়ার পথ আকস্মিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন হওয়ায় কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। তবে উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো প্রশাসনের সাথে সম্মিলিত হতে না পারলেও নিজেরা শোভাযাত্রা করে শহরকে বর্ণিল করে তোলেন নববর্ষের সকালে।

শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করেছে যশোরের চারুপীঠ। যে প্রতিষ্ঠানটি দেশে বাংলা বর্ষবরণ শোভাযাত্রার আতুড় ঘর তারা এবার ‘নিত্য নতুনের অমৃতধারা’ প্রতিপাদ্যে তৈরি ১৮ ফুট উচ্চতার বিশাল একটি মোরগ, যা নতুন দিনের জাগরণ ও আশার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কবুতর, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি এবং বর্ণিল মুখোশ, যা শোভাযাত্রাকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
শুধু চারুপীঠ নয়, এসএম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজও এবারের আয়োজনে ভিন্নধর্মী চমক যুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের তৈরি ১৪ ফুট উঁচু হাতি ও ঘোড়ার কাঠামো শোভাযাত্রায় বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কাঠ, বাঁশ ও কাপড় দিয়ে তৈরি এসব শিল্পকর্মে রঙের ব্যবহার ও নান্দনিক নকশা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে। ঐতিহ্যগতভাবে হাতি ও ঘোড়া শক্তি ও আভিজাত্যের প্রতীক হওয়ায় এগুলো শোভাযাত্রায় এক ধরনের ঐতিহাসিক আবহও তৈরি হয়।

 বর্ষবরণ যশোরে
বাংলা বর্ষবরণ শোভাযাত্রা যশোরে

শোভাযাত্রার আগে যশোরবাসী মিলিত হন পৌর উদ্যানে। সেখানে উদীচীর বর্ণাঢ্য আয়োজন বরাবরের মতো এবারও শহরবাসীকে মোহিত করেছে। বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজনে উদীচী যশোর এবার ৫০ বছর পূর্ণ করলো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্বে গান, কবিতা, নাটক ও পথনাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গণমানুষের কথা।
এছাড়া শহরের নবকিশলয় মাঠে বিবর্তন যশোর ও সুরধুনীর যৌথ আয়োজনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হয়েছে। সকালের অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। বিকেলে গীতিনাট্য, দলীয় সংগীত ও একক পরিবেশনায় তুলে ধরা হয় সমকালীন সামাজিক বার্তা। আয়োজকদের দাবি, এবারের অনুষ্ঠান শুধু বিনোদন নয়, বরং শান্তি ও মানবিকতার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

যশোর বর্ষবরণ
সাংস্কৃতিক সংগঠন পুনশ্চ যশোরের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত – লোকসমাজ

পুনশ্চ, তির্যক, সুরবিতান, কিংশুক, যশোর সংস্কৃতিক পরিষদ, স্বপ্নচারী নিকেতন, আইডিইবি, মাইকেল সঙ্গীত একাডেমী, নৃত্য বিতান, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, অগ্নিবীণা কেন্দ্রীয় সংসদ, রূপকার, সূর নিকেতন, সুরধ্বনি, থিয়েটার ক্যানভাসসহ অন্যান্য সংগঠনগুলোও নিজস্ব আয়োজন নিয়ে অংশ নিয়েছে এই উৎসবে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট মঞ্চে পরিবেশিত হবে লোকসংগীত, আধুনিক গান, আবৃত্তি ও নাট্যাংশ। এতে করে পুরো শহরজুড়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রায় এক হাজার সংস্কৃতিকর্মীর অংশগ্রহণে এবারের বর্ষবরণ আয়োজন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন পর বড় পরিসরে আয়োজন হওয়ায় শিল্পীদের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস রয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।

শহরের নবকিশলয় বিদ্যালয় চত্বরে বিবর্তন যশোর ও সুরধুনীর অনুষ্ঠান- লোকসমাজ

তবে উৎসবকে ঘিরে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে জেলা প্রশাসন। নিরাপত্তার স্বার্থে মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি সব অনুষ্ঠান সন্ধ্যার আগেই শেষ করার নির্দেশনা পালিত হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যাতে উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

সব মিলিয়ে শোভাযাত্রার বর্ণিলতা, মঞ্চের পরিবেশনা এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নববর্ষের দিন যশোর হয়ে ওঠে প্রাণের উৎসবে মুখল এক শহর। নতুন বছরের প্রথম দিনে এই সম্মিলিত আয়োজন শুধু আনন্দই নয়, বরং ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল বার্তা ছড়িয়ে দিল।