একটু পড়লে পাস আর মোটামুটি পড়লে ৫; এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে -শিক্ষামন্ত্রী

0
ছবি: লোকসমাজ।

বিগত সরকারের সময় নকলের ধরন পাল্টে ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’ শুরু হয় এবং বর্তমানে অনেক শিক্ষক তাদের নৈতিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়ে শিক্ষাদান করছেন।

সোমবার দুপুরে যশোর পিটিআই অডিটোরিয়ামে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত খুলনা বিভাগের কেন্দ্র সচিবদের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এসব কথা বলেন।

শিক্ষার পরিবর্তন কোনো সরকার বা মন্ত্রীর একার পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমি সংসদে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে চাই। সংসদকে শিক্ষার উন্নয়নের মূল আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

বিরোধীদলীয় এমপিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আশা করি তারা অন্ততপক্ষে দিনে দুই থেকে তিনটি নোটিশ শিক্ষার ওপর দেবেন। আমি আনন্দচিত্তে জবাব দেব, কখনোই ক্ষুব্ধ হবো না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জবাবদিহিতার সাথে চালানোর জন্য আমি বদ্ধপরিকর। সংসদে ঝড় উঠলে সরকার শিক্ষার সমস্যাগুলো আমলে নেবে, এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক সবাই উপকৃত হবে।

সাবেক সরকারের সমালোচনা করে শিক্ষামন্ত্রী মিলন বলেন, অতীতে অনেকেই নকল প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ২০০১ সালের পর সরকার কঠোরভাবে নকল নির্মূল করতে সক্ষম হলেও করোনা-পরবর্তী সময়ে তা ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’র রূপ নিয়েছে। এটি প্রতিরোধে শিক্ষক ও প্রশাসনকে আরও সজাগ হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

তিনি বলেন, বিগত সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে এবং শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে দিয়েছিল যে একটু পড়লেই পাস আর মোটামুটি পড়লে জিপিএ-৫। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা আনতে ১৯৮০ সালের শিক্ষা আইন সংশোধনের ঘোষণা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, এখন থেকে পরীক্ষকদের মূল্যায়িত খাতা থেকে ‘র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং’ বা নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় যাচাই করা হবে। যাতে শিক্ষকরা সঠিকভাবে নম্বর দিচ্ছেন কি না তা নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষার খাতা অন্যকে দিয়ে মূল্যায়ন বা ‘বর্গা দেওয়া’ বন্ধে কড়াকড়ি করা হবে এবং নতুন দক্ষ পরীক্ষক তৈরিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বিশেষ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী জানান, উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জন্ম নিবন্ধনের সাথে সাথে একটি স্থায়ী আইডি নম্বর দেওয়া হবে। এই একটি আইডি দিয়েই শিক্ষা, পুলিশি ভেরিফিকেশন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সব সেবা নিশ্চিত হবে, যা শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব ঘটাবে।

শিক্ষকতাকে কেবল পেশা নয়, বরং ‘ইবাদত’ ও ‘ছদকায়ে জারিয়া’ হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা নকল করলে সেই দুর্বলতা শিক্ষকের। বিগত সময়ে শিক্ষকরাই নকলে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অধিকাংশ শিক্ষক নিজের প্রতিষ্ঠানে নিজের সন্তানদের পড়ান না। শিক্ষকদের জন্য আলাদা পে-স্কেল করার ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান, কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের তুলনায় শিক্ষকদের ওপর বেশি নজরদারি ও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

যশোর শিক্ষা বোর্ড আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আসমা বেগম। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নার্গিস বেগম ভয়হীন চিত্তে কাজ করার আহ্বান জানান এবং বর্তমান সরকারের শিক্ষা ও ৩১ দফার উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অনুরোধ করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মতিউর রহমান, যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট গাজী এনামুল হক, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুক্তার আলী, নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু, বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আলিম, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মিয়া নুরুল হক।

জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সভায় যশোর শিক্ষা বোর্ডসহ খুলনা বিভাগের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রায় ৫ শত কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষা কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভায় মন্ত্রী শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাণিজ্য বন্ধের কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। মন্ত্রী আরও বলেন, বিগত সময়ে শিক্ষকদের মানসিকতা বদলে দেওয়া হয়েছিল, এখন আপনাদের সহায়তায় আবারও পরিবর্তন আনতে চাই। শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমান ব্যবস্থা কোনো হুমকি নয়, বরং সকল নজরদারি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য।

পরে শিক্ষামন্ত্রী যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) “সিরিমনি অন সাবমিশন অফ ইনটেন্ট টু অ্যাপ্লাই ফর ব্যাক অ্যাক্রেডিটেশন” শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) আয়োজনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমিক ভবনের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরিফ হোসেন গ্যালারিতে এ অনুষ্ঠান হয়। যবিপ্রবির ১৪ টি বিভাগ বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের (বিএসি) স্বীকৃতির জন্য একযোগে আবেদন করছে। তারই উপলক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, যবিপ্রবি দেশের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যতেও এই ধারা বজায় রাখতে সরকার সর্বোচ্চ সহায়তা করবে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) থেকে স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে যবিপ্রবি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এটা আসলে প্রশংসনীয়। আশা করি ভবিষ্যতে যবিপ্রবির প্রত্যেকটি বিভাগ বিএসির স্বীকৃতি অর্জন করবে এবং যবিপ্রবি শুধু দেশ নয় বিশ্বের সঙ্গেও পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাবে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আরও বলেন, তোমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি রিসোর্সফুল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তোমাদের জ্ঞান অর্জন ও গবেষণার মাধ্যমে এই জাতির প্রতি তোমদের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা তোমরা পরিশোধ করবে। দায়বদ্ধতা থেকে দেশপ্রেম শুরু হয়। আশা করি তোমরা নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলবে।

প্রধান অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। তিনি তার বক্তেব্যে বলেন, তরুণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে যবিপ্রবি শুধু দেশ নয় বিশ্বেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশ পুনর্গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, নড়াইল ২ আসনের এমপি মো. আতাউর রহমান, যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক. ড. মোসাম্মাৎ আসমা বেগম, আইকিউএসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়াও যবিপ্রবি বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল এর স্বীকৃতির জন্য কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তার তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন আইকিউএসির অতিরিক্ত পরিচালক ড. কে এম আনিস উল হক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা নিয়ে প্রেজেন্টেশন তুলে ধরেন আইকিউএসির অতিরিক্ত পরিচালক ড. ফারহানা ইয়াসমিন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যবিপ্রবির বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান, দপ্তরপ্রধানসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন যবিপ্রবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. হোসেন আল মামুন।