অবৈধ অস্ত্রের ঝুঁকিতে যশোরের নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা

0
ছবি: সংগৃহীত।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যশোরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর থেকে চলতি জানুয়ারি মাস পর্যন্ত জেলায় অন্তত ৬২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এসব হত্যার অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বড় একটি অংশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক নেতা ও সচেতন মহলের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় সহিংসতার মূল ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

যশোরে সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড জনমনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অভয়নগরের নওয়াপাড়ায় কৃষক দল নেতা তরিকুল ইসলাম, মণিরামপুরে ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগী এবং যশোর শহরের শংকরপুর এলাকার বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনের হত্যাকাণ্ড স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বিশেষ করে রানা প্রতাপ বৈরাগী ও আলমগীর হোসেনকে এক দিনের ব্যবধানে একই কায়দায় গুলি করে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ডে চরমপন্থি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও তাদের ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত ও উদ্ধার করা যাচ্ছে না। ফলে একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে।

এদিকে অপরাধীরা ধরা পড়লেও অধরা থেকে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের নিয়মিত ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রসমূহ। যার কারণে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে সামনে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

যশোর শহরের উপশহর এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি খুনের ঘটনার পর পুলিশ আসামি ধরে ফেলছে, কিন্তু অস্ত্রগুলো থেকেই যাচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়। এ জন্য বড় পরিসরে অভিযান জরুরি।’

একই এলাকার আরেক বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিশেষ অভিযান চলছে বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসালেও অস্ত্র উদ্ধারের খবর তেমন পাওয়া যাচ্ছে না।’

রফিকুল ইসলাম নামে এক স্কুলশিক্ষক বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বাড়বে, এ কথা অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। ৫ আগস্টের পর প্রায় এক বছর ধরে নানা নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা হলেও আওয়ামী লীগ আমলে যেসব সন্ত্রাসী যশোরে অস্ত্র উঁচিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। বরং তাদের অনেককেই এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে।’

এ বিষয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার বলেন, ‘বিগত সময়ে যশোরে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধের মূল রহস্য উদঘাটনসহ আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের কাছ থেকে অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধী ও অস্ত্র উদ্ধারে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও মনে করছেন, নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা ঠেকাতে অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘যখন অস্ত্র সহজলভ্য থাকে, তখন গ্রেপ্তারের পরও একই ধরনের অপরাধ ঘটে। তাই নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দৃশ্যমান উদ্যোগ জরুরি।’

একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার মাঠপর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যশোরে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বিভিন্ন অপরাধী ও চরমপন্থি গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে। হত্যার পর গ্রেপ্তার হলেও অস্ত্র উদ্ধার না হলে ঝুঁকি থেকেই যাবে। নির্বাচনকে ঘিরে এসব অস্ত্র বড় ধরনের সহিংসতার কারণ হতে পারে।

যশোর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চারটি, ফেব্রুয়ারিতে তিনটি, মার্চে ছয়টি, এপ্রিলে ছয়টি, মে মাসে সাতটি, জুনে আটটি, জুলাইয়ে ছয়টি, আগস্টে ছয়টি, সেপ্টেম্বরে দুটি, অক্টোবরে সাতটি, নভেম্বরে তিনটি এবং ডিসেম্বরে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম পাঁচ দিনেই আরও দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

তবে চলতি জানুয়ারির দুটি হত্যাকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও কৌশল সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।