সরকারের ২৭৯ কোটি টাকা অপচয়ের হিসেব দেবে কে?

ভৈরব নদের অস্তিত্ব হননকারীরা নেই কোনো আলোচনায়

0

তহীদ মনি ॥ শ শ কোটি টাকা নয়ছয়ের মাধ্যমে প্রমত্তা ভৈরব নদকে মরা খালে পরিণত করার নেপথ্য কারিগররা কোনো আলোচনায় নেই। উন্নয়নের নামে আখের গোছানোর সাথে জড়িতরা এখনো চিহ্নিত হয়নি।

তদন্তের অনুমতি চেয়ে দুনীতি দমন কমিশন(দুদক) যশোর অফিস থেকে প্রধান কার্যালয়ে কয়েকটি চিঠি পাঠানো হলেও সেগুলোর হদিস মিলছে না। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এসব দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষুব্ধ যশোরবাসী।

ভৈরব নদ বাঁচাতে ও জোয়ারভাটা ফিরিয়ে আনতে ২০১৬ সালে প্রথমে ২৭২ কোটি ও পরে আরো বরাদ্দ দিয়ে ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদী খনন কাজ করে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২২ সালে কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। কাজ সমাপ্তের পর যশোরবাসীর পক্ষ থেকে বলা হয় নদকে একটি মরা খালে পরিণত হয়েছে।

খননে কোনো সুফল মেলেনি। এ নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা জানান, লুটপাটের জন্য যেনোতেনোভাবে ভৈরব নদের খনন শেষ করা হয়েছে। খনন শেষ হওয়ার আগেই ভরাট হয়েছে ভৈরব নদ। ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয় নয় পকেটস্থ হয়েছে। এত কিছুর পরেও তৎকালীন সরকার কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং জোয়ার ভাটা সৃষ্টি হয়েছে বলে গুজব ছড়ানো হয়।

বিগত সরকারের সময়ে পাউবোর অদূরদর্শীতায় শত কোটি টাকার দুর্নীতি এবং প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের পকেট ভারী হলেও এবং নদটি হত্যা করে রাষ্ট্রের ও জনগণের বিপুল ক্ষতিসাধন করলেও সবাই পার পেয়ে যায়। কিন্তু পট পরিবর্তনের পর যশোরবাসী আশা করেছিল, এবার হয়তো অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ হবে, পরিবেশ দূষণকারী প্িরতষ্ঠান সিল করা হবে, আইনের আওতায় আসবে, টাকা লোপাটকারীরা দুদকের জালে ধরা পড়বে বিচার হবে। যারা দীর্ঘদিন ভৈরব নদ নিয়ে আন্দোলন করছে তারা তো বটেই সর্বস্তরের মানুষও এমটি আশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় শহরবাসীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বসুন্দিয়া এলাকার মানুষ জানান, খননের আগে আফ্রা ঘাট থেকে ছাতিয়ানতলা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রবল জোয়ার আসতো। এখনো জোয়ার আসে। তবে গতি বেশ কম। নদের দু পাশে পানি বেশি, মাঝখানে কম। নদের ওপর থাকা সেতুগুলোর পাশের মাটি কাটা হয়নি। রাজারহাট এলাকাবাসী জানান, এখানকার ব্রিজের কারণে এতদিন জোয়ারভাটা হয়নি বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড দাবি করতো কিন্তু নতুন ব্রিজ হয়েছে বহুদিন, এখনো কেনো জোয়ার ভাটা কেন হয় না সেটি আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। ব্যাখ্যা দিতে পারবে পাউবো।

এ প্রসঙ্গে যশোর পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক এমদাদুল হক জানান, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে পরিবেশ উন্নয়নের কোনো সম্ভাবনা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ভৈরব নদের শহরাংশে ২৭টি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে চিঠি দেওয়া, জরিমানা করা, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকরাসহ সকল ধরনের পদক্ষেপ শেষ হয়েছে, কোনো লাভ হয়নি। আপাতত ৪ টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এ মাসেও আরো কয়েকটি মামলা করা হবে। তিনি জানান, একটা নদী জীবন্ত কিনা তা পরীক্ষার ৮ থেকে ১০টি প্যারামিটার রয়েছে। এর একটিও ভৈরবের নেই। কাজেই ভৈরবকে কোনভাবেই জীবন্ত বলার সুযোগ নেই। বরং নদটি অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। নদ দূষণের জন্য দায়ী ২৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পৌরসভা, সদও হাসপাতাল, জেলখানান, কুইন্স হাসপাতালের মত বড় বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

যশোর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক) সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান জানান, ভৈরব নদ খননে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্যে তিনি এবং তৎকালীন দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক) যশোরের সমন্বিত জেলার উপপরিচালকের যৌথ স্বাক্ষরে ৩টি আবেদন দুর্নীতি দমন কমিশন হেড অফিসে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ভৈরব নদের ছবি, বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কাটিংসহ তথ্য ছিল। প্রধান কার্যালয় অনুমতি দিলে অনুসন্ধান শুরু হতো এরপর পরবর্তী ধাপের কর্মকাণ্ড। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পরবর্তীতে ঢাকায় খোঁজ নিয়ে সে সব চিঠির অস্তিত্ব তিনি বা যশোরের ডিডি খুঁজে পাননি।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান, যশোর থেকে চিঠি পাঠালে প্রধান অফিস থেকে হারিয়ে যেতো। সে সময় ওই অফিসের অমুসলিম একজন উপপরিচালক ছিলেন (বর্তমানে নেই) তার টেবিল থেকে হারিয়ে যেতো। তিনি আরও বলেন, ওই সময়ের যশোরের পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে দায়ী করেই মূলত আবেদন করা হয়েছিল, যেভাবে পত্র পত্রিকায়ও এসেছিল। তিনি এখনো মনে করেন এই নদ খননে অস্বচ্ছতা এবং অনিয়মের তদন্ত ও অনুসন্ধান দুদকের পক্ষ থেকে হওয়া উচিৎ, সত্য বের করা উচিৎ এবং কেনো প্রকল্পের শুরুতে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে কেনো একজন মন্ত্রী রাতারাতি বদলি করে কক্সবাজারে পাঠিয়েছিলেন তারও তদন্ত হওয়া উচিত।

যশোরে চাউর ছিল নদ রক্ষা ও খননে উচ্ছেদ তালিকায় ওই মন্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পত্তি ছিল, সেটা তালিকাভুক্ত না করে মন্ত্রীর আদেশ অমান্য করে ওই প্রকৌশলী তালিকায় সেই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখার চেষ্টা করায় তাকে বদলী হতে হয়। যশোর দুদুক অফিসের সহকারী পরিচালক(এডি) আল আমিন জানান, যশোর অফিস থেকে ভৈরব নদের অনিয়ম বা এ রূপ কোনো বিষয়ে অনুসন্ধানের কোনো চিঠি দেওয়া হয়েছে কিনা তা তার জানা নেই।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, ৫ আগস্টের পর তেমন কোনো কাজ নদের জন্যে করা হয়নি, উচ্ছেদও করা হয়নি। অতীতে উচ্ছেদের সময় ঝামেলা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে জানানো হয়, এর আগে যখন স্থাপনা উচ্ছেদ করতে যাওয়া হয় তখন দড়াটানার স্ক্যান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামলা করে অথচ ১৩ ফুট বাই ৪৯ ফুট তাদের স্থাপনাটি নদের মধ্যেই রয়েছে।

তবে আগামীতে উচ্ছেদ ও বেড়া দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আর রাজারহাটে নতুন ব্রিজ হলেও তলদেশে রয়েছে বাঁধ যা সরানোর দায়িত্ব ব্রিজ কর্তৃপক্ষের। ওই বাঁধের কারণে পানি শহরাংশে প্রবেশ করতে পারছে নাা। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর কিছু কচুরিপানা পরিষ্কার করা হয়েছে।