স্পিডবোট দুর্ঘটনায় বিচার করতে হবে

পদ্মায় আবারো নৌযান দুর্ঘটনা ঘটলো। ঘটলো মানুষের প্রাণহানী। এবার প্রাণ হারালো ২৬ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ছিল এক পরিবারের চারজনের প্রাণহানী। খুলনার এই পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র শিশু কন্যার নাম মীম। মীমা জানায়, দাদার মৃত্যুর খবরে তারা তিন বোন পিতা-মাতার সাথে ঢাকা থেকে খুলনায় যাচ্ছিল। পদ্মা পার হতে তারা একটি স্পিড বোডে ওঠে। বোটটি অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বেপরোয়া গতিতে যাবার সময় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ডুবে যায়। এ সময় সে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও তার পিতা-মাতা ও দুই বোন পানিতে ডুবে মারা যায়। সে আরও জানায়, স্পিড বোটের বেপরোয়া গতিতে যাত্রীরা ভীত হয়ে সাবধানে চালাতে বলে। ্ সেময় তারা তিন বোন ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। তারপরও দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি কতটা মর্মান্তিক তা শুধু যারা স্বজন হারিয়েছে তারাই ভালেণা বুঝবেন। আমরা শুধু অনুমানে অনুভব করতে পারি মাত্র। আমরা মৃতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোকাহত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। একই সাথে সার্বিক তদন্ত ও বিচার দাবি জানাচ্ছি। মীমের জন্য জানাচ্ছি সমবেদনা এবং অনেক দোয়া। আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন। একথা আমরা সবাই জানি, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে এখন ‘লকডাউন’ চলছে। লকডাউনে হাইওয়েতে যেমন বাসের বা অন্য গণপরিবহনের চলাচল বন্ধ, তেমনি নৌপথেও যাত্রী পরিবহনকারী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কিন্তু এ বিধি মানা হচ্ছে না। হচ্ছে না বলেই পদ্মায় স্পিডবোটে যাত্রা করে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ২৬ জনের। গত সোমবার সকালে একটি বালুবাহী কার্গোর সঙ্গে ধাক্কা লেগে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাট থেকে সকাল ৬টার দিকে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট যাত্রা করে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাংলাবাজার ঘাটের উদ্দেশে। কাঁঠালবাড়ী (পুরনো ফেরিঘাট) ঘাটের কাছে নদীর পারে নোঙর করা একটি বাল্কহেডের (বালুবাহী কার্গো) পেছনে সজোরে ধাক্কা খেয়ে দুমড়েমুচড়ে যায় নৌযানটি। পদ্মায় ছিটকে পড়ে ৩১ জন যাত্রীর সবাই। সাঁতরে তীরে ফেরে মাত্র পাঁচজন। ২৬ জন তলিয়ে যায়। জানা গেছে, কারোর গায়েই লাইফ জ্যাকেট ছিল না।
খবর পেয়ে নৌ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে সেনা সদস্য, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। দুপুরের মধ্যে শিশুসহ ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মাদারীপুর জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সোমবার রাত পর্যন্ত ২৫ জনের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছে। আহত পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
করোনা পরিস্থিতির কারণে লকডাউনে নৌপথে লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই চলে এসব নৌযান। জানা যায়, ওই পথে চার শতাধিক স্পিডবোট অবৈধভাবে চলাচল করছে, যেগুলোর কোনো রেজিস্ট্রেশনও নেই। বিশেষ কারণে ঘাট এলাকায় থাকা কোনো কর্তৃপক্ষই তাদের চলাচলে বাধা দেয় না। এসব স্পিডবোটে যেমন অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়, তেমনি এগুলো চালায় অনেক অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক, যাদের নৌযান চালানোর প্রায় কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। প্রশিক্ষণও নেই। তদুপরি যাত্রীদের জন্য লাইফ জ্যাকেটও রাখা হয় না এসব নৌযানে। অথচ নৌযানগুলো প্রায় নিয়মিতভাবে যাত্রী বহন করে।
ঘাট ইজারাদার, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিআইডাব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের যাঁরা সেখানে কর্মরত আছেন, তাঁরা কেউ কি এই দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারেন? অবিলম্বে অবৈধ নৌযানগুলোর চলাচল বন্ধ করা হোক। পাশাপাশি তদন্তের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ভাগ