সেপ্টেম্বরে ভয়ংকর হতে পারে ডেঙ্গু

0
জুলাই ও আগস্টে সংক্রমণ লাফিয়ে বাড়ায় আগামী সেপটেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ২৪ হাজার ৮৪৮ জন আক্রান্তের পাশাপাশি ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে।। ছবি: সংগৃহীত

দেশে আবার ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিন দ্রুত বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা, সেই সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। বিশেষ করে জুলাই এবং আগস্ট মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণের গতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী সেপটেম্বর মাসে রোগটি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৭ আগস্ট ২০২৬) পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ২৪ হাজার ৮৪৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৭১ জন। এর মধ্যে কেবল শেষ ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে আরও ৮৭০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং এক ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের শুরুর দিকে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুন মাস থেকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন এবং আগস্টের প্রথম ১৭ দিনেই ৯ হাজার ৫৩৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের বড় অংশই (১৮ হাজার ৭৪৪ জন) ভর্তি হয়েছেন গত দেড় মাসে।

একসময় ডেঙ্গু প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এবার এর বিস্তার ঘটছে দেশের সব প্রান্তে। শেষ ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি ১৮১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকাগুলোতে।

এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ১৫৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৪৬, বরিশালে ১০২, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭৭, রাজশাহীতে ৫৭, ময়মনসিংহে ৫১ এবং রংপুরে ১৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

চলতি বছরে মোট আক্রান্তের মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ভর্তি হয়েছেন ১৭ হাজার ৯৬৭ জন এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬ হাজার ৫১৫ জন।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অবস্থাও উদ্বেগজনক। আগস্টের প্রথম ১১ দিনেই সেখানে ৩৬১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে চট্টগ্রাম নগরের ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টিতেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। সংগৃহীত ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতে লার্ভা মেলায় শহরের ৮টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার এ বিষয়ে জানান, বর্ষার জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। আগস্টের সার্বিক চিত্র বিবেচনায় সেপটেম্বর ও অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।

চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত ৭১ জনের মধ্যে ৪৩ জন নারী এবং ২৮ জন পুরুষ। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (১২ জন)। এ ছাড়া ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৮ জন, ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৭ জন এবং ১৫ বছর বা তার কম বয়সী অন্তত ৯ জন ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু জুলাই মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ জন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী জানান, সেপটেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বরে প্রাদুর্ভাব আরও বাড়তে পারে, যা মোকাবিলায় তাঁদের প্রস্তুতি রয়েছে।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী পরামর্শ দিয়ে বলেন, “জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, পেটে ব্যথা, দুর্বলতা বা রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।”

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো তুলনামূলক কম। তবে জেলায় জেলায় চিকিৎসার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”