লালদীঘিতে ফের সুকৌশলে চলছে ভরাটের কাজ, পৌর কর্তৃপক্ষের মুখে পুরনো কাসুন্দি

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘির পুকুর ভরাটের অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রায় দেড় মাস ধরে যশোর পৌর কর্তৃপক্ষের নির্মাণাধীন ১০ তলা শপিং কমপ্লেক্সের কাজ বন্ধ রয়েছে। অথচ থামছে না লালদীঘিতে মাটি, বালি ও আবর্জনা ফেলার কাজ। এভাবে সুকৌশলে ভরাট করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। এ নিয়ে যশোর শহরবাসীর মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। অথচ এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের মুখে আবার বাজছে সেই পুরনো কাসুন্দি।
যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত লালদীঘি পুকুরের উত্তর পাশে তৃতীয় নগর পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দশতলা বিশিষ্ট পৌর হেরিটেজ নামে এই বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয় যশোর পৌরসভা। তিনমাস আগে এই ভবন নির্মাণে ইতিমধ্যে পাইলিংয়ের জন্য হাইড্রোলিক পাইলিং রিগ নামের বিশাল আকৃতির একটি অত্যাধুনিক মেশিং ব্যবহার করা হয়। ভবনের দৃঢ় ভিত্তির জন্য ৪৯ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ৭৫৩ টি প্রি-কাস্ট পাইপ পুততে গিয়ে ব্যবহার করা হয় হাইড্রোলিক পাইলিং রিগ মেশিং। কিন্তু ভবনটি নির্মাণ কাজ চলার মধ্যেই লালদীঘির উত্তর পাশে মাটি দিয়ে ভরাট করায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। অনেকে এটিকে পুকুর ভরাটের সুকৌশল হিসেবে দাবি করেন। এ প্রেক্ষাপটে যশোরের সচেতন মহলের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করলে গত ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাণিজ্যিক ভবনের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন যশোরের জেলা প্রশাসক।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাণিজ্যিক ভবনের কাজ বন্ধ থাকলেও থেমে নেই লালদীঘি ভরাটের কাজ। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে বাইরে থেকে মাটি ও ময়লা এনে সুকৌশলে ফেলার অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি পৌরসভার গাড়িতে এনে সেখানে বালু ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুকুর পাড়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, লালদীঘির উত্তর পাশে সুকৌশলে মাটি ফেলে ভরাট করার কাজ চলমান রয়েছে। গভীর রাতে বা ভোর রাতে এসব কাজ করা হচ্ছে। যারা এসব কাজের সাথে জড়িত তারা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। অন্যদিকে পুকুরের পাশের রাস্তা পুননির্মাণের সময়ে কৌশলে দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাশে মাটি ফেলা হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিয়ে যশোর পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারা এ ধরণের খবরকে গুজব বলে দাবি করেছেন। যশোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন, ভবনের নির্মাণ কাজ কিছুদিন বন্ধ ছিলো সেটি আবার শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যে কারণে উত্তর পাশে বালি ফেলে হাইড্রোলিক পাইলিং রিগ মেশিং বসানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাইলিং শেষে আবার ওই মাটি ও বালি তুলে ফেলা হবে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে। আমরা কাজের নকশা অনুযায়ী ডাঙা সীমানার বাইরে কোন প্রকার যাবো না। বরং লালদীঘিকে আরও দৃষ্টিনন্দন করা হবে। এ বিষয়ে কারোর বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফের কথা হলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আপাতত ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে। কাজ পুনরায় চালু হওয়ার কোনো খবর আমার জানা নেই। ফলে লালদীঘিতে মাটি ফেলার যে কথা উঠছে সে বিষয়ে আমার কাছে এখনো কেউ অভিযোগ দেয়নি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান। এদিকে লালদীঘির পুকুরটিতে আবারো মাটি ফেলার ঘটনায় যশোরের নাগরিক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। তারা ঐতিহ্যবাহী পুকুরটিকে রক্ষার জন্য সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে যশোর শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু বলেন, ১৯৮৪ সাল থেকে যশোরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা এই পুকুরটির ওপর শুকনের দৃষ্টি পড়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা নাগরিকরা পৌরসভার মেয়রের কাছে গেলে এক ধরনের কথা বলেন আবার সাংবাদিকরা গেলে তাদের কাছে আরেক ধরনের কথা বলেন। অথচ কাজ করেন তার উল্টোটা। আমরা ইতিপূর্বে এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের কথা শুনে ভবনের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন। অথচ এখন শুনছি নাকি আবার কাজ শুরু হচ্ছে। আসলে কাজ শুরু হচ্ছে না বন্ধ রয়েছে সে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। লালদীঘির পুকুর রক্ষা আন্দোলনের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, লালদীঘির যে ম্যাপ রয়েছে সেই ম্যাপ অনুযায়ী পুকুরটি অক্ষত রাখা হোক এ বিষয়ে আমরা পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষেরও সচেতন হওয়া উচিৎ। ম্যাপ অনুযায়ী পুকুরের সীমানায় মাটি ফেলা ঠিক হবে না। ঐতিহ্যবাহী এই পুকুর রক্ষার জন্য অতীতের মতো যেকোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, পুকুরটি ভরাট হোক এটি যশোরের কোন মহলই চান না। ফলে এ বিষয়ে সবাই সতর্ক হবেন বলে আশা করছি।