যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ নিয়ে উদ্বেগ

0
ছবি: সংগৃহীত।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের অনুমতি ছাড়াই ভিডিও ধারণ করছেন। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সামাজিক মর্যাদা ও হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রের দাবি, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রকাশের জন্য কাজ করা কিছু ব্যক্তি নিয়মিত হাসপাতাল এলাকায় অবস্থান করেন। কোনো ঘটনা ঘটলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি হাসপাতালে এলে তারা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তি বা রোগীর সম্মতি নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সাংবাদিকতা ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হলেও রোগী ও সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে চিকিৎসাধীন রোগী, নারী, শিশু, স্বজন কিংবা কোনো ব্যক্তির অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ও মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এলেই বাড়ে ভিড়

হাসপাতালে কোনো মন্ত্রী, সচিব, সরকারি কর্মকর্তা বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এলে মোবাইল ফোন হাতে ভিডিও ধারণকারীদের উপস্থিতি বেড়ে যায় বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। অনেক সময় একাধিক ব্যক্তি একসঙ্গে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হাসপাতালের চলাচলের জায়গা সংকুচিত করে ফেলেন। এতে চিকিৎসক, রোগী ও স্বজনদের স্বাভাবিক চলাচল এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

হাসপাতালের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সংবাদ সংগ্রহের প্রয়োজনে সাংবাদিকদের হাসপাতালে আসা স্বাভাবিক। তবে সংবাদ সংগ্রহের নামে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করা, রোগীর চিকিৎসার সময় ভিডিও ধারণ করা কিংবা অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি প্রকাশ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

রোগীর গোপনীয়তা রক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন রোগী সাধারণত শারীরিক ও মানসিকভাবে স্পর্শকাতর অবস্থায় থাকেন। তার ছবি, ভিডিও কিংবা চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশিত হলে তা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, নারী ও শিশু, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো ঘটনা সংবাদযোগ্য হলেও তা প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু ভিডিও পাওয়া গেছে বলেই সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘সাংবাদিক’ পরিচয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ
হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহে আসা ব্যক্তি প্রকৃত সাংবাদিক কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রকাশ করেন, এমন ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা বা পরিচয়পত্র রয়েছে কি না, তা সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়।

এ কারণে সাংবাদিকতার পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন হাসপাতালের পরিবেশ বা রোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত করতে না পারেন, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম ও প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে অনলাইন সাংবাদিকতা বা মোবাইল সাংবাদিকতা নিজেই কোনো সমস্যা নয়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দ্রুত তথ্য, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ এখন সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অংশ। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন তথ্য সংগ্রহের নামে ব্যক্তির সম্মতি, গোপনীয়তা, মর্যাদা ও সাংবাদিকতার নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন
এ বিষয়ে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত ও আরএমও ডা. মো. আহসান কবির বাপ্পির সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, হাসপাতাল এলাকায় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের প্রবণতা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, প্রত্যেক মানুষেরই সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদা রয়েছে। কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ছবি বা ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

হাসপাতাল কর্মকর্তারা বলেন, সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে রোগী, চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও তারা মত দেন।

সচেতনতা ও নিয়ম মানাই সমাধান
হাসপাতাল একটি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র, কোনো সাধারণ জনসমাগমস্থল নয়। এখানে একজন মানুষের অসুস্থতা, চিকিৎসা, ব্যক্তিগত তথ্য ও পারিবারিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই সংবাদ সংগ্রহের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রোগীর গোপনীয়তা, সম্মতি ও মর্যাদাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সাংবাদিক, অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতাল এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম চালু করা গেলে একদিকে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও সুরক্ষিত থাকবে।