যশোর শহরের বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ট্যারা সুজন ও নিপু বাহিনী

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর শহরের বৃহৎ একটি অংশ সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই অংশটির রাজত্ব করছে ট্যারা সুজন ও নিপু বাহিনী।
আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার ছত্রছায়ায় থেকে খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে এই বাহিনী সাধারণ মানুষের মাঝে আতংক সৃষ্টি করেছে। অথচ প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সন্ত্রাসী বাহিনী প্রধান ট্যারা সুজনের বাড়ি যশোর আইটি পার্ক সংলগ্ন বেজপাড়া কোল্ড স্টোরেজ মোড় এলাকায়। পিতার নাম জিন্নাত আলী। বর্তমানে তারা হামিদপুরের নুড়িতলায় বসবাস করে। বাহিনীর অপর প্রধান নিপুর বাড়ি শহরের বেজপাড়ায় আনসার ক্যাম্প এলাকায়। তার পিতার নাম আবু হাসান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ট্যারা সুজন ও নিপু খুবই দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন থাকাকালে স্থানীয় নেতাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে তারা নানা রকম অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এক সময় গোটা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে গড়ে তোলে ট্যারা সুজন ও নিপু বাহিনী। এই বাহিনী যশোর পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেজপাড়া মেইন রোড, বেজপাড়া কবরস্থান (তালতলা), জিরো পয়েন্ট, আর এন রোড জোড়া কুঠির, বকচর, হুশতলাসহ বেশিরভাগ এলাকাতেই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলোর কাউন্সিলররা হলেন যথাক্রমে শাহেদ হোসেন ওরফে হিটার নয়ন, বাবলু নাথ ও অ্যাডভোকেট বাবলু। সন্ত্রাসীরা তাদের কর্মকাণ্ড অটুট রাখতে এই জনপ্রতিনিধিদের সাথে গড়ে তোলে সখ্যভাব। তারাও (জনপ্রতিনিধিরা) এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করেন। এছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা এই সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে দুর্ধর্ষ বানিয়েছেন। তারাও নিজেদের স্বার্থ হাসিলে সন্ত্রাসীদের নানা কাজে ব্যবহার করেন।
জানা গেছে, ট্যারা সুজন ও নিপু বাহিনীর অন্যতম সদস্যরাও এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি করে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ২৫/৩০ জন করে। যাদের সিংহভাগই কিশোর অপরাধী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লোকজন জানান, ট্যারা সুজন ও নিপু বাহিনীর অন্যতম সদস্য সন্ত্রাসী জাহিদ বকচর স্কুল পাড়া এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। সে তার গ্রুপ নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। বাহিনী প্রধান ট্যারা সুজন ও জাহিদ শংকরপুর এলাকার আফজাল হত্যা মামলার আসামি। সূত্র মতে, ২০১৮ সালে মুড়লী জোড়া মন্দির এলাকায় আওয়ামী সন্ত্রাসী নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়ার টাক ইব্রাহিম, ট্যারা সুজন ও জাহিদসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ওপর হামলা চালায় এবং তাকে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করে। যদিও বিএনপি নেতাকর্মীদের সাহসী ভূমিকায় তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ওইদিন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শেষ করে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে পড়েন।
জানা গেছে, সন্ত্রাসী ট্যারা সুজন ও জাহিদ বকচর স্কুল পাড়া এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করছে। এই গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য হলো-রাজা, সম্রাট, আরমান, সানোয়ার, নয়ন, রাসেল, ইমদাদুল ও রানা। এরা বকচর এলাকায় মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির সাথে জড়িত।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের দিন সন্ধ্যায় সন্ত্রাসী বাহিনী প্রধান নিপু ও জাহিদসহ অনেকে বকচর স্কুল পাড়ার নদী পাড়ের বাসিন্দা নিখিল নামে এক ব্যক্তির পরিবারের ওপর হামলা চালায় এবং চাঁদা দাবি করে। একই সাথে তাদেরকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে হিন্দু পরিবারটি আতংকে রয়েছে। এখানে হামলার সময় অন্য সন্ত্রাসীদের মধ্যে আর এন রোড জোড়া কুঠির এলাকার বাবু, সিটি কলেজ পড়ার বাবু রায় ও রিপন, বেজপাড়া মেইন রোড এলাকার ঘাড় কাটা পান্না, সবুজ, আকাশ, ডলার, বাবু ও হাসান চৌধুরী, মোল্লাপাড়ার হেদায়েত মোল্লা, অপু জামান ও দ্বীন এবং রেলগেট মোদীর সড়কের ফরহাদ শেখ ছিল বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দুর্ধর্ষ ট্যারা সুজন ও নিপু বাহিনী আওয়ামী নেতাদের মদদে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় তাদের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আজও সক্রিয়। জানা গেছে, ট্যারা সুজন ও নিপু বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দু শতাধিক। এদের বেশিরভাগই কিশোর বয়সী। সন্ত্রাসীদের অনেকের কাছে রয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র।
এদিকে আওয়ামী সরকারের পতনের পর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা আবারো এলাকায় ফিরে এসেছে। তারা বীরদর্পে সন্ত্রাস চালালেও পুলিশ প্রশাসন বরাবরের মতো নীরব রয়েছে। দুর্ধর্ষ ট্যারা সুজন ও সন্ত্রাসী নিপু বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এলাকাবাসী যৌথ বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, সুজন ও নিপুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অপরাধের অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। সেই সাথে উদ্ধার হবে এদের কাছে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র।