বদলি বাণিজ্য রোধে লটারি পদ্ধতি, প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন দিগন্ত

0
বদলি বাণিজ্য রোধে লটারি পদ্ধতি, প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন দিগন্ত

শৈবাল রহমান : সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এ পদক্ষেপ সফল হলে সরকারি প্রশাসনে বদলি-বাণিজ্য বন্ধের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাবরেজিস্ট্রারদের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোর জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলার কর্মরত সাবরেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে ভূমি ও রেজিস্ট্রেশন-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আর্থিকভাবে লাভজনক বা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পদায়ন পেতে অনেক ক্ষেত্রে তদবির ও ঘুষের আশ্রয় নেওয়া হয়। এর ফলে দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ নাগরিকের ওপর।

একই ধরনের অভিযোগ প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বাস্থ্য খাত, প্রকৌশল বিভাগ, বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ কিংবা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই পছন্দের কর্মস্থলকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এই বাস্তবতায় লটারি পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব, সুপারিশ বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কমে আসবে। যোগ্য কর্মকর্তাদের একটি নির্ধারিত তালিকা থেকে প্রকাশ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মস্থল নির্ধারণ করা হলে বদলি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়তে পারে।

তবে শুধু লটারি চালু করলেই দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় রাখতে হবে। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তিনির্ভর, প্রকাশ্য এবং নিরীক্ষাযোগ্য হওয়া জরুরি।

সাবরেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কার্যকর প্রমাণিত হলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদেও এর প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এতে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও বিতর্ক কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষ বা তদবির ছাড়া দায়িত্ব পান, তাহলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাঁর নৈতিক দায়বদ্ধতা বাড়ে। তখন পদটি পাওয়ার বিনিময়ে অর্থ উদ্ধারের মানসিকতা নয়, বরং দক্ষতা ও সততার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করার প্রবণতাই বেশি কাজ করার কথা।

সুতরাং সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে হবে না; এটি সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। সঠিক বাস্তবায়ন ও নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে এ উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।