বাংলাদেশ–ভারত যৌথ কার্যদলের বৈঠক আজ শুরু, যা থাকছে বাণিজ্য আলোচনায়

0
তিন বছর পর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের দুই দিনব্যাপী বৈঠক শুরু হয়েছে। এতে স্থলবন্দরের বাধা দূর, পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক প্রত্যাহার ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের বৈঠক আজ শুরু হয়েছে নয়াদিল্লিতে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের (জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ) এই বিশেষ বৈঠক শুরু হয়। এতে স্থলবন্দরের বাধা দূর করা, পাটপণ্যে ভারতের শুল্ক পুনর্বিবেচনা করা এবং দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য স্বাভাবিক করাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে যোগ দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল গতকাল নয়াদিল্লি পৌঁছেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সৃষ্টি হওয়া নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করা আর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের কার্যকর উপায় নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক আরোপ এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে বাংলাদেশের বিধিনিষেধের বিষয়টি এই বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

তিন বছর পর এই দুই দেশের বাণিজ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের আগের বৈঠকটি হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায়। এর আগে ১৪তম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ২০২২ সালের ২ ও ৩ মার্চ ভারতের নয়াদিল্লিতে।

পরবর্তীকালে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল নিয়মিত বাণিজ্য আলোচনায়। ফলে নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত এই বৈঠকটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।

পূর্বে অনুষ্ঠিত আগের বৈঠকগুলোয় মূলত স্থলবন্দর ও সমন্বিত সীমান্তচৌকির অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দরসংক্রান্ত নানা বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, সীমান্ত হাট চালু করা, রেলপথে পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া পণ্যের মানদণ্ড নির্ধারণে সমন্বয় ও পারস্পরিক স্বীকৃতি দান, বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি নিয়ে যৌথ সমীক্ষা পরিচালনা এবং পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপোস্টে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু রাখার বিষয়গুলোও পূর্বে আলোচনার টেবিলে ছিল।

এদিকে নানা বিধিনিষেধ আরোপের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে স্থলপথের বাণিজ্য বেশ কমে এসেছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের একটি বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে স্থলবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানির বিশেষ সুবিধা বন্ধ করে দেয়। তবে সমুদ্রপথে সুতা আমদানির সুযোগ যথারীতি বহাল রাখা হয়।

এই সিদ্ধান্তের কয়েক সপ্তাহ পরেই ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, পিভিসিসহ বিভিন্ন পণ্য স্থলপথে আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরবর্তীতে ওই বছরের জুন মাসে পাট ও নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্রপণ্যের আমদানির ক্ষেত্রেও এই বিধিনিষেধ বিস্তার করা হয়।

এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যস্ততম বেনাপোল স্থলবন্দরের রপ্তানি পরিসংখ্যানে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ টন। অথচ তার আগের অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ টন।

তবে রপ্তানির পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে গেলেও সার্বিক রপ্তানি আয় প্রায় কাছাকাছিই ছিল। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ১৭৫ কোটি ডলার, যেখানে তার আগের অর্থবছরে আয় ছিল ১৭৬ কোটি ডলার।

এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ঠিক আগেই বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে সামনে এসেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে নতুন করে আমদানি করা পাটের সুতা ও টুইন, হেসিয়ান কাপড়, পাটের বস্তা ও স্যাকিং ক্লথের ওপর সংশোধিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক নির্ধারণ করে।

ভারতীয় প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাটের সুতা ও টুইনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার। তবে ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, নতুন কোনো তদন্তের ভিত্তিতে এই শুল্ক আরোপ করা হয়নি; বরং আগের আরোপিত শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই নতুন হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশ থেকে আমদানি করা পিইটি ফিল্মের ওপর প্রতি টনে সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার অধিদপ্তর (ডিজিটিআর)। এর মধ্যে বাংলাদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আকিজ বায়াক্স ফিল্মসের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত শুল্কের পরিমাণ প্রতি টনে ৫৮ ডলার। তবে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত এই সুপারিশটি কার্যকর হচ্ছে না।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা তৈরির আগে গত মে মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠকে দেশের ব্যবসায়ীরা স্থলবন্দরের অনভিপ্রেত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, অশুল্ক বাধা দূর করা ও পূর্বে বাতিল হওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনরায় চালুর জোরালো সুপারিশ করেছিলেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পবনকুমার তুলসীদাস বাধে গত মাসে এফবিএসসিআই নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। সেখানে তিনি শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর পরামর্শের পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি যৌথ ব্যবসায়ী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন।

এরও আগে গত আগস্ট মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সীমান্ত হাট নতুন করে চালু করা, সীমান্ত স্থলবন্দরগুলোর পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি মূল আলোচনায় উঠে এসেছিল।