লোকালয়ে বন্যপ্রাণী প্রবেশ রোধে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বেড়া নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে

0

আলী আকবর টুটুল, বাগেরহাট ॥ বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ উপজেলায় সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় নাইলনের বেড়া নির্মাণকাজ হচ্ছে। লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্যপ্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পেতে এই বেড়া নির্মাণে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
প্রকৃতির এই অপূর্ব সম্পদ রক্ষায় সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও বন সংলগ্ন লোকালয়ের মানুষকে দীর্ঘদিন ধরেই বন্যপ্রাণীর হানা ও অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছিল।
তারা আশা করছেন, এ উদ্যোগ বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে প্রবেশ রোধ করবে এবং বনজসম্পদ রক্ষায় সহায়ক হবে। সুন্দরবন ঘেঁষা গ্রামগুলোর মানুষের জন্য বন্যপ্রাণীর হানা কোনো নতুন বিষয় নয়। বিশেষ করে রাজাপুর, রসুলপুর, সোনাতলা, চালিতাবুনিয়াসহ প্রায় ২০টি গ্রামের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন,‘আগে প্রায়ই বাঘ, বন্য শুকর, বানরসহ বিভিন্ন প্রাণী আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ত। রাতের বেলা আতঙ্কে ঘুমাতে পারতাম না। কয়েক বছর আগে আমাদের পাশের গ্রামে এক বৃদ্ধকে বাঘে আক্রমণ করেছিল। বেড়া নির্মাণ হলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে।’ শাহানা বেগম নামের আরেক বাসিন্দা জানান,‘আমাদের ধানক্ষেত থেকে শুরু করে সবজি বাগান পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে বন্য শুকর রাতের আঁধারে এসে ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে দেয়। এখন যে বেড়া নির্মাণ করা হচ্ছে, তা দেখে মনে হচ্ছে অন্তত ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া, গবাদিপশুর জন্যও এই বেড়া আশার আলো দেখাচ্ছে।’ বাচ্চু শেখ নামে এক কৃষক বলেন, ‘আমাদের গরু-ছাগল প্রায়ই বনের ধারে চরে বেড়াত। তখন তারা বন্যপ্রাণীর আক্রমণের শিকার হতো। কয়েক মাস আগে এক প্রতিবেশীর গরুকে বাঘে নিয়ে গেছে। এখন এই বেড়া হলে অন্তত সে ধরনের ঘটনা কমে যাবে বলে মনে হচ্ছে।
বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবনের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভোলা ও খড়মা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বনের বাঘ, শুকর ও হরিণ সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করছিল। এতে একদিকে যেমন মানুষের জানমালের ক্ষতি হচ্ছিল, অন্যদিকে গবাদিপশু বনাঞ্চলে ঢুকে বন্যপ্রাণীর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছিল। এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে বন বিভাগের উদ্যোগে ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের’ আওতায় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয় নাইলনের বেড়া নির্মাণকাজ। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। বেড়ার দৈর্ঘ্য হবে ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৫ কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ চলতি বছরে শেষ হবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুদীপ্ত কুমার সিংহ বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন নদী, খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় লোকালয়ের সঙ্গে বনের দূরত্ব কমেছে। ফলে খুব সহজে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে, অন্যদিকে লোকালয়ের মানুষজন ও গবাদিপশু বনে অবাধে বিচরণ করছে। বেড়া নির্মাণকাজের পর বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে প্রবেশের হার কমবে, ফলে বন্যপ্রাণী হত্যা ও সংঘাতের আশঙ্কাও হ্রাস পাবে। পাশাপাশি, নদী পুনঃখনন হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর হবে এবং বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন,‘সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি নদী পুনঃখননের কাজও একই প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। চলতি বছরেই আমাদের এসব কাজ শেষ হবে, যাতে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হয়।’