চাকরিপ্রার্থীদের অপহরণ যবিপ্রবির ৬ ছাত্রলীগ কর্মীর নামে মামলা, হলে নিষ্ফল অভিযান পুলিশের

0

স্টাফ রিপোর্টার॥ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) লিফট অপারেটরের নিয়োগ পরীক্ষা দিতে আসা ১৭ চাকরিপ্রার্থীকে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে যশোর কোতয়ালি থানায় ভুক্তভোগী প্রার্থী আরাফাত হোসেন বাদি হয়ে বিদ্যালয় ছাত্রলীগের ৬ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। এছাড়া অজ্ঞতা আসামি করা হয়েছে আরও ৫-৬ জনকে। এদিকে আসামিদের আটকের জন্যে বৃহস্পতিবার রাত দুইটার দিকে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মসিয়ূর রহমান ছাত্র হলে অভিযান চালাতে যায়। কিন্তু ছাত্রলীগ আগেই অভিযানের খবর পেয়ে হলের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে ভিতরে সমবেত হয়ে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিতে থাকে।
পুলিশ জানায়, মামলার বাদি মো. আরাফাত হোসেন ইমন যশোর সদর উপজেলার বালিয়া ভেকুটিয়া গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে। তিনি মামলায় ৬ জনকে আসামি করেছেন। আসামিরা হলেন- যবিপ্রবির ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী ও এ বিভাগের ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মো. বেলাল হোসেন, কর্মী গণিত দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাফি হাসান, মো. রেদোয়ান হাসান রাফি, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রায়হান রাব্বি, সিএসই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী যশোর শহরের ষষ্ঠীতলা বুনোপাড়ার বাসিন্দা মো. শোয়েব ও পিইএসএস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. শাহিনুর। এছাড়া মামলায় নির্দেশদাতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সোহেল রানার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় আরাফাত হোসেন ইমন উল্লেখ করেছেন, যবিপ্রবির লিফট অপারেটর পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্যে তিনিসহ তার বন্ধু তাজউদ্দীন মিরান ও সোহান হোসেন গত ৭ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্বাবিদ্যালয়ের সামনে যান। পরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার জন্যে প্রধান ফটকের সামনে গেলে উল্লিখিত আসামিরা তাদের ভুল বুঝিয়ে মসিয়ূর রহমান হলে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে তারা তাদেরকে জোর করে আটকে রাখেন। এছাড়া আসামিরা তাদেরকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। তখন আরাফাত হোসেন ইমনরা প্রতিবাদ করলে আসামিরা তাদেরকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন। আসামিদের মধ্যে রাফি হাসান চাকরিপ্রার্থী আরাফাত হোসেন ইমনকে গলাটিপে হত্যার চেষ্টা চালান। এরপর বিকেল ৪টার দিকে আসামিরা চাকরিপ্রার্থীদের যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের ওপর নিয়ে যান এবং বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধামকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। যে কারণে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তিনি মামলায় আরও উল্লেখ করেছেন, তার ধারণা যবিপ্রবির পিএসএস বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সোহেল রানার নির্দেশে উল্লিখিত আসামিরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অভিযুক্ত সোহেল রানা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি।
কোতয়ালি থানা পুলিশের ওসি মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, চাকরিপ্রার্থীদের অপহরণ ও আটকে রাখার সাথে জড়িতদের ধরতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে। তবে কাউকে আটক করা যায়নি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, রাত দুইটার দিকে পুলিশ ক্যাম্পাসে আসে। ছাত্রলীগের কর্মীরা আগেই খবর পেয়ে যায় যে, পুলিশ রাতে ছাত্র হলে অভিযান চালাবে। যে কারণে হলের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে ছাত্রলীগ হলের ভিতর থেকে শ্লোগান দিতে থাকে। যে কারণে পুলিশ রাতে হলের ভিতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেনি। এই বিষয়ে ওসি আব্দুর রাজ্জাক কোন মন্তব্য করতে রাজী হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ সূত্র জানা গেছে, সম্প্রতি লিফট অপারেটরের ১২টি পদে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আবেদনপত্র যাচাইবাছাই শেষে ৩৮ প্রার্থীকে পরীক্ষার জন্যে বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে ডাকা হয়। সকাল ১০টা থেকে চাকরিপ্রার্থীরা ক্যাম্পাসে আসতে থাকেন। সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত তাদের ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে খবর আসে প্রার্থীদের মধ্যে অত্যন্ত ১৭ জনকে ক্যাম্পাসের ছাত্র হলে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ ক্যাম্পাসে পৌঁছালে বিকেলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি তদন্তের স্বার্থে সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক সংগ্রহ করতে গেলে সেটিও ছিনিয়ে নেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এরপর সন্ধ্যায় আটকে রাখা প্রার্থীদের মধ্যে আরো পাঁচজনের পরীক্ষা নেওয়া হয়। ৩৮ প্রার্থীর ২৬ জন শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে পেরেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘চাকরির পরীক্ষা দিতে এলে ১৭ প্রার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সোহেল রানার লোকজন আটকে রাখে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাত্র হলের যে কক্ষগুলোতে প্রার্থীদের আটকে রাখা হয়, সেসব কক্ষে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা থাকে। ক্যাম্পাসে পুলিশ ডাকা হলে বিকেলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অপহরণ ও সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ড ডিস্ক ছিনতাইয়ের ঘটনার অপরাধে মামলা করা হবে। একই সঙ্গে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আগামি রোববার বিশ্ববিদ্যালয় রিজেন্ড বোর্ডের বৈঠক রয়েছে। ওই বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। তারপরেই মামলা ও তদন্ত কমিটি হবে।