ভিটিএস ছাড়া এয়ারসাইডে গাড়ি চলাচল বন্ধ ৭ ডিসেম্বর থেকে

৭ ডিসেম্বরের পর নির্দেশনা কার্যকর, বারবার সময় দিয়েও ট্র্যাকার স্থাপনে পিছিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান

0
ভিটিএস ছাড়া এয়ারসাইডে গাড়ি চলাচল বন্ধ ৭ ডিসেম্বর থেকে

লোকসমাজ ডেস্ক: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোনে চলাচলকারী যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপন বাধ্যতামূলক করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তবে একাধিকবার নির্দেশনা ও সময়সীমা নির্ধারণের পরও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকে এ নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। এ অবস্থায় আগামী ৭ ডিসেম্বরের পর ভিটিএস ছাড়া কোনো যানবাহনকে বিমানবন্দরের এয়ারসাইডে চলাচলের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেবিচক।

বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকায় যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বা অনুমোদনহীন চলাচল বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোনে উড়োজাহাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সেবামূলক যান চলাচল করে। এসব যানবাহনের অবস্থান ও গতিবিধি তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা না গেলে উড়োজাহাজের নিরাপদ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী ও কর্মীদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, এয়ারসাইডে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন যান কোথায় রয়েছে, কী গতিতে চলছে এবং অনুমোদিত এলাকায় অবস্থান করছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা প্রয়োজন। রানওয়ে বা ট্যাক্সিওয়েতে কোনো যানবাহনের সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

তাঁর মতে, বেবিচকের নির্দেশনা বাস্তবায়নে এয়ারলাইন্সগুলোর বিলম্ব নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। দ্রুত সব যানবাহনকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি এবং নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম বলেন, ভিটিএস স্থাপনের জন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার সময় দেওয়া হয়েছে এবং বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এবার আর সময় বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিটিএস স্থাপন না করলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনকে এয়ারসাইডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

তিনি জানান, বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোয় এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। শাহজালাল বিমানবন্দরে ভিটিএস কার্যকর হলে এয়ারসাইডে চলাচলকারী অনুমোদিত যানবাহনের অবস্থান ও গতিবিধি কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় এসব গাড়ির চলাচল পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

কোন এয়ারলাইন্স কতটি গাড়িতে ভিটিএস স্থাপন করেছে এবং কতটি গাড়িতে এখনো স্থাপন বাকি, তা জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, এয়ার অ্যাস্ট্রা, স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্সসহ বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একাধিকবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন এলাকায় উড়োজাহাজ ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ভিটিএস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেবিচকের সূত্র অনুযায়ী, সদ্য স্থাপিত সিএনএস-এটিএম এবং অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেমের (এ-এসএমজিসিএস) সঙ্গে সমন্বয় করে এ ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বেবিচকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ জুনের মধ্যে সব যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন করে সংশ্লিষ্ট তালিকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়। এরপরও নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিলম্ব দেখা যায়।

এ অবস্থায় গত ২৬ অক্টোবর বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে ‘অতীব জরুরি’ চিঠি জারি করা হয়। পরিচালক মো. শামসুল হকের সই করা ওই চিঠিতে ২৭ অক্টোবরের মধ্যে সব যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন সম্পন্ন করে শতভাগ বাস্তবায়নের তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সময়সীমাও পার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এরপরও কোনো উড়োজাহাজ কোম্পানি ভিটিএসযুক্ত যানবাহনের তালিকা জমা দেয়নি।

এ পরিস্থিতিতে তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনসংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ৭ ডিসেম্বরের পর ভিটিএস ছাড়া কোনো যানবাহন এয়ারসাইডে চলাচল করতে পারবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। বেবিচকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করার কারণে কোনো দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তাঝুঁকি সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়ভার বহন করতে হবে।

বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যানবাহনে ট্র্যাকার স্থাপন করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি গাড়ির অবস্থান ও গতিবিধি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। কোনো গাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করলে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিমান ওঠানামার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।

তবে ভিটিএস স্থাপনে বিলম্বের কারণ হিসেবে সরঞ্জাম আমদানির বিষয়টি সামনে এনেছে এয়ার অ্যাস্ট্রা। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড এয়ারলাইন সিকিউরিটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম সারওয়ার জামান বলেন, ভিটিএস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এ কারণে কিছুটা সময় লাগছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগেই ভিটিএস স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভিটিএস স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় তালিকা বেবিচকের কাছে জমা দেওয়া হবে।

বিমানবন্দরের এয়ারসাইডে যানবাহন চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন ঘটনায় উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে।

গত বছরের নভেম্বরে শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় ফ্লাইটটি বাতিল করতে হয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালে বিমানের হ্যাঙ্গার থেকে একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ বের করার সময় সেটি সেখানে অবস্থানরত আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজকে ধাক্কা দেয়। একই বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ট্রলি বিমানের একটি উড়োজাহাজে আঘাত করে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এয়ারসাইডে যানবাহনের অবস্থান ও চলাচল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণ করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এ-এসএমজিসিএস) এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন ও সংলগ্ন এলাকায় চলাচলকারী বা অবস্থানরত উড়োজাহাজ এবং অন্যান্য যান্ত্রিক যান শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড সাপোর্ট যান, ক্যাটারিং ভ্যান, কার্গো ভ্যান, বাস ও অন্যান্য সেবামূলক যানবাহনে প্রয়োজনীয় ট্র্যাকার স্থাপন না করায় প্রযুক্তিটির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সাধারণত নির্মাণের সময় থেকেই সংযোজিত থাকে। কিন্তু বিভিন্ন সেবামূলক যানবাহন শনাক্ত করতে সেগুলোতে আলাদা ভেহিকেল ট্র্যাকার স্থাপন করতে হয়।

বিমানবন্দরের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে শতাধিক ভেহিকেল ট্র্যাকার ও সংশ্লিষ্ট শনাক্তকরণ সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব। তবে যানবাহনে ট্র্যাকার স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যানবাহনকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় আনা না গেলে বিদ্যমান প্রযুক্তির কার্যকারিতা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাবে না।

ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিটিএস স্থাপন এবং বেবিচকের নির্দেশনা বাস্তবায়নই এখন বিমানবন্দরের এয়ারসাইডে নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।