হাওরে চালের ক্ষতি ২ লাখ টন, দাম বাড়ছে

0
বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান পানি থেকে নৌকায় তুলছেন কৃষকেরা।। ছবি: সংগৃহীত

হাওরে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চালের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন, যা বোরো মৌসুমের মোট উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ। তবে এই তুলনামূলক সামান্য ক্ষতিও বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। রাজধানীর পাইকারি বাজারগুলোতে গত তিন-চার দিনে চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে।

রাজধানীর বাবুবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ান বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বোরো মৌসুমের শুরুতে চালের দাম কমতে শুরু করলেও সেই ধারা স্থায়ী হয়নি। বাবুবাজারে বর্তমানে মোটা চাল প্রতিকেজি ৪৫-৪৬ টাকা, পাইজাম ও বিআর-২৮ চাল ৫১-৫২ টাকা, মিনিকেট ৬০-৬৬ টাকা এবং নাজিরশাইল মানভেদে ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে খুচরায় মোটা চাল কেজিতে ৪৮ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৫২ থেকে ৬৮ টাকা এবং সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রেজা জানান, বোরো মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই চালের দাম কমে। এবারও কমছিল, কিন্তু এখন আবার বাড়ছে। বাবুবাজারের শিল্পী রাইস এজেন্সির মালিক কাওসার রহমান জানান, সপ্তাহখানেক আগে নতুন সরু চাল পুরোনো চালের চেয়ে কেজিতে ১০ টাকা কম ছিল, এখন সেই ব্যবধান কমে সব ধরনের চালে ২ থেকে ৫ টাকা বাড়তি দর দেখা দিচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত মাত্র ৯ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া — এই সাত জেলায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি কৃষক। হাওরের মোট ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমির মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৯ হাজার হেক্টর, যা হাওরের মোট জমির প্রায় ১১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে, এরপর নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ।

অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার অতিরিক্ত পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন জানান, গত দুই বছর হাওরে আগাম বন্যা না হওয়ায় এবার ধান চাষ শুরু হয়েছিল ১০ থেকে ১২ দিন দেরিতে। তার ওপর আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল একসঙ্গে আসায় কৃষকদের ক্ষতি অনিবার্য হয়ে পড়ে। মৌসুমের মাঝখানে ডিজেলসংকটে সেচ বিঘ্নিত হওয়াও উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে।

তুলনায় ২০১৭ সালে পরিস্থিতি ছিল অনেক ভয়াবহ। সে বছর বোরো মৌসুমে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ টন এবং আমনেও ১৫ লাখ টন কম উৎপাদন হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর সেপ্টেম্বরে মোটা চালের দর কেজিতে ৪৮ টাকায় পৌঁছেছিল — আগের বছরের চেয়ে ১৭ টাকা বেশি, যা ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি। এবারের ক্ষতি তার তুলনায় অনেক কম হলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জনপ্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এতে মোট ১৭৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে হিসাব করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার জানান, মে, জুন ও জুলাই — এই তিন মাস সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং এ মাস থেকেই তা শুরু হবে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর বলেন, চালের দাম বাড়ছে, অথচ কৃষকেরা ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। সামনে চাল মালিকদের সিন্ডিকেট তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, কৃত্রিম সংকট তৈরির পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তাঁর পরামর্শ, সরকারের চালের মজুত কোনো অবস্থাতেই ১২ লাখ ৫০ হাজার টনের নিচে নামানো যাবে না। বর্তমানে সরকারি মজুত রয়েছে ১২ লাখ ৬১ হাজার টন।

বিশ্লেষকদের একাংশ নির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করে চাল আমদানি উন্মুক্ত রাখার পক্ষেও মত দিচ্ছেন, যাতে দাম বাড়লে আমদানির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়। এদিকে এপ্রিলে দেশের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে চালের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।