মুঠোফোন সেবা: ১০০ টাকার মধ্যে ৫৬ টাকাই নেয় সরকার

0
মুঠোফোন সেবায় ১০০ টাকার আয়ে ৫৬ টাকাই সরকারের; উচ্চ করভারে পিছিয়ে পড়ছে দেশের ডিজিটাল রূপান্তর ।। প্রতীকী ছবি: এআই/লোকসমাজ

বাংলাদেশে মুঠোফোন সেবা থেকে অপারেটরদের মোট আয়ের ৫৬ শতাংশই চলে যায় সরকারের তহবিলে — কর, ফি ও রাজস্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে মাত্র ৪৪ টাকা অপারেটরের হাতে থাকে। মোবাইল অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, এই হার বৈশ্বিক গড়ের (২২ শতাংশ) দ্বিগুণেরও বেশি এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গড় (২৫ শতাংশ) থেকেও অনেক বেশি।

আজ রোববার বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবসে এই তথ্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল জীবনধারা: সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’।

করের স্তর ও হার

অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহককে বর্তমানে মুঠোফোন সেবায় ১৮ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। সব মিলিয়ে গ্রাহকের মোট করভার দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশ। এর বাইরে নতুন সিম কেনা বা হারানো সিম তুলতে দিতে হয় ৩০০ টাকা। অপারেটরদের মুনাফার ওপর কর রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে সাড়ে ৫ শতাংশ হারে রাজস্ব ভাগ করতে হয় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে দিতে হয় আরও ১ শতাংশ।

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম বলেন, কার্যকর কর ও বাধ্যতামূলক পরিশোধের চাপ হিসাব করলে অপারেটরদের মোট বোঝা দাঁড়ায় ৬৮ থেকে ৭২ শতাংশ পর্যন্ত। তিনি বলেন, ”ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগ খুব সীমিত হয়ে পড়ছে। ১৫ বছর ধরেই শিল্প খাতটি এ বাস্তবতার মুখোমুখি।”

তরঙ্গ নবায়নে বিশাল ব্যয়

চলতি বছর সব অপারেটরকে আগে নেওয়া তরঙ্গ নবায়ন করতে হবে। এই নবায়ন ফি দাঁড়াবে প্রায় ১৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হলে বাড়তি ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা গুনতে হবে। ইতিমধ্যে গ্রামীণফোন ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ কিনেছে মেগাহার্টজ-প্রতি ২৩৭ কোটি টাকায়; মোট ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৯ কোটি টাকা।

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ”তরঙ্গ নবায়নের উচ্চ ব্যয় টেলিকম অপারেটরদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।”

গ্রাহক কমছে, পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

দেশে বর্তমানে মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৬১ লাখ। তবে জিএসএমএর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সক্রিয় গ্রাহক কমেছে প্রায় এক কোটি এবং মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমেছে ১ কোটি ৩৩ লাখ। সংগঠনটির মতে, সিমের ওপর উচ্চ কর এবং সেবার বাড়তি ব্যয় এর অন্যতম কারণ।

প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকেরা এর জন্য স্মার্টফোনের চড়া দাম ও মুঠোফোন সেবার বাড়তি মূল্যকে দায়ী করেন। অপারেটররা দায়ী করে উচ্চ কর ও ফির হারকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, কর ও ফির চাপে টিকে থাকতে অপারেটরগুলো সেবার দাম বাড়ায়, ফলে সেবার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ কমে যায়। তার মতে, ডিজিটাল সেবা সহজলভ্য করতে ডেটা ও ভয়েস সেবাকে সাশ্রয়ী করার দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, ”গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, ডিজিটাল জীবনধারার প্রসার এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে টেলিযোগাযোগ খাতের করহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। এটি করা হলে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।”

কর কমানোর ইঙ্গিত সরকারের

প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ কর কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। গতকাল রাজধানীতে এক সেমিনারে তিনি বলেন, ”আমরা হয়তো সব সমস্যা এই বাজেটে সমাধান করতে পারব না। তবে ধারাবাহিকভাবে সমাধানের জন্য আমরা দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারব।”

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার রাজস্ব আদায়ের সহজ উপায় হিসেবে টেলিযোগাযোগ খাতকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের সেবায় উচ্চ কর সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলে নিম্ন আয়ের মানুষকে।