ঢাকা শিশু হাসপাতালের বাইরে ভয়ঙ্কর চিত্র

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ মহামারি করোনা ও ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালগুলোতে ঢাকা ও বাইরের জেলা থেকে ছুটে আসছেন রোগীরা। রোগীদের পাশাপাশি স্বজনদেরও থাকতে হচ্ছে হাসপাতালে। কিন্তু তাদের পিছু ছাড়ছে না করোনা ও ডেঙ্গুর আতঙ্ক। রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা শিশু হাসপাতালে শুধু শিশুদের জন্য চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। শিশুদের সঙ্গে স্বজনরা ভেতরে থাকার সুযোগ পান না। এমন অনেক স্বজন হাসপাতালের বাইরে রাতদিন কাটান ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে। হাসপাতালটির করোনা ইউনিটের সামনে বিশ্রাম নেয়ার জন্য টিনের ছাউনি দেয়া একটি ঘর।
ঘরের চারপাশে ফাঁকা। কোনো বেড়া নেই। পাশে ড্রেন এবং আগাছায় ভরা। খোলা জায়গায় একটি পাইপ লাইন দিয়ে গোসল করছেন অনেকে। বৃষ্টি হলেই ভেতরে পানিতে ভরে যায়। একটু বিশ্রামের আশায় কয়েকশমানুষ রাতে-দিনে একত্রিত হন সেখানে। মশার কামড়ে অতিষ্ট তারা। মশারি ও দুই-তিনটি কয়েল একসঙ্গে জ্বালালেও মশার কামড় থেকে রক্ষা নেই তাদের। এদিকে খাবার পানিরও নেই কোনো সুব্যবস্থা।
টাঙ্গাইল থেকে করোনা আক্রান্ত নাতি মাহিমকে নিয়ে এসেছেন সুরিয়া বেগম। তিনি বলেন, মা ছাড়া ভেতরে কাউকে থাকতে দেয়া হয়না। মঙ্গলবার ভর্তি করেছি। তার ডায়রিয়া ও জ্বর ছিল। রোববার করোনা পরীক্ষা করানো হবে। এখন সে করোনা ইউনিটে ভর্তি আছে। বাচ্চার কাছে মা থাকে। রাতদিন ওষুধ ও অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। বাচ্চার মা তো আর বাচ্চাকে রেখে বাইরে প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে যেতে পারেন না। সেজন্য আমাদের হাসপাতালে থাকা। রাত একটার দিকেও স্যালাইন লেগেছে। তখন বাইরে গিয়ে আনতে হয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে থাকতে না দিলে বিপদে তো এক জায়গায় থাকতে হবে। এজন্য এখানে থাকা। দিনে রাতে মশার কামড়ে টিকতে পারিনা। রাতে এত মানুষ হয়, পা ফেলার জায়গা থাকে না।
হারুন-অর রশীদ বলেন, ১১ দিন ধরে ১৪ দিনের বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। তার ব্রেনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। চিকিৎসক দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসার কথা বলেছেন। তবে এর মধ্যে কীভাবে থাকে। অনেক কষ্ট হয়। বাচ্চার কাছে তার মা থাকে। আর কাউক থাকতে দেন না। হাসপাতালে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা নেই। দায়িত্বপ্রাপ্তরাও খুব ভালো ব্যবহার করেন না। ছোট বাচ্চাকে নিয়ে তার মা কীভাবে একা সামলাবে। খাবার পানিরও কোনো সুব্যবস্থা নেই। পঙ্গু হাসপাতাল থেকে খাবার পানি কিনে আনতে হয়। বাথরুমও নেই। একটা আছে সেটাও রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের সামনে বাগানে গাছের নিচে ঘুমাই। মশার কামড়ে থাকা যায়না। একসঙ্গে এত মানুষ পাশাপাশি থাকলে করোনা হওয়ারও ভয় আছে। ঢাকাতেও কেউ নেই যে তাদের কাছে থাকবো।
শহিদ মিয়া কুমিল্লা থেকে ১১ বছরের ভাগ্নিকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। তার ব্রেনের সমস্যা। তিনি বলেন, ৬ দিন ধরে হাসপাতালে। রাতে একটু ঘুমাতেও পারি না। হাসপাতালের কোনো মেঝেতে থাকতে দেয়না। এই ফাঁকা ঘরে থাকতে হয়। চারিদিকে অনেক মশা। এই ঘরটিতে একটু বেড়া দিলেই ভালো হতো। হাসপাতালে কি মানুষ সুখে আসে। ভেতরে একটু থাকতে দিলে তো এভাবে মশার কামড় খেতে হতো না। অপর এক স্বজন ফারুকী বলেন, ১১ দিন ধরে ভর্তি আছি। বাচ্চার অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু হওয়ার ভয় আছে। পাশে ড্রেন ও জঙ্গল।
একমাস ধরে নাতিকে নিয়ে হাসপাপতালে আছেন মো. হানিফ। সে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। আরও ৬ মাস থাকতে হবে। হাসপাতালের ভেতরে কোথাও থাকতে দেয় না আনসার সদস্যরা। বাধ্য হয়ে বাগানে থাকা। রাতেও এখানে থাকবো বলে জানান তিনি। এদিকে দুইমাস ধরে করোনা ইউনিটে ভর্তি ছিল ৪ বছরের তাওসিফ। তার বাবা শরীফুল বলেন, তার ব্রেনে সমস্যা। দুইবার করোনা পরীক্ষা করার পর রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। এরপর আবার পজেটিভ আসে। ৬ দিন করোনা ইউনিটে ভর্তি ছিল। ছেলের জন্য হাসপাতালে থাকতে হয়। বাধ্য হয়ে এই ঘরের নিচে থাকি। না থেকে উপায় নেই। রাতে মশার কামড়ে অস্থির। মশা মারলে এক কেজি হবে। ছেলের চিকিৎসা দিতে এসে নিজেই করোনা ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হই। বুঝলাম ভেতরে অতিরিক্ত কাউকে অ্যালাউ করে না। কিন্তু আমাদেরতো হাসপাতালের মেঝেতে একটু জায়গা দিতে পারে। দুইতিনটা কয়েল দিলেও কাজ হয়না। মশারি দিলেও কাজ হয়না।