সভাপতিতে অশান্তি বাঘারপাড়ার খবির-উর-রহমান কলেজে চলছেই

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা,অনিয়ম আর অন্যায় হস্তক্ষেপের কারণে যশোরের বাঘারপাড়ার খবির-উর-রহমান কলেজের শিক্ষার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। তার একের পর এক অন্যায় কর্মকান্ড, হামলা-মামলা, নির্যাতন ও অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষসহ শিক্ষক-কর্মচারীরা এখন পুরো অসহায় হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় প্রতিকার চেয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা।
২০০০ সালে বাঘারপাড়ার জহুরপুর ইউনিয়নের নিভৃত পল্লীতে গড়ে ওঠা এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বেশ সুনাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সৌহার্দ্য পরিবেশে শিক্ষার মান দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ধারাবাহিকতায় ২০০৬-২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে যশোর শিক্ষাবোর্ডের মধ্যে পাশের হারের দিকে ৯ম ও ২য় স্থান অর্জন করে। আর ২০০৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বাঘারপাড়া উপজেলার মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করে। কিন্তু বর্তমানে কলেজটি নানা ষড়যন্ত্রের কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। বিশেষ করে কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতির অব্যাহত ষড়যন্ত্র ও অযাচিত কর্মকান্ডের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন।
অভিযোগে জানা গেছে, জহুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার রহমান দিলু পাটোয়ারীর বড়ভাই বর্তমান জহুরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মাদ পাটোয়ারীকে ২০১৯ সালে রাজনৈতিক প্রভাবে কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি পদে মনোনীত করা হয়। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব¡ নেওয়ার পর থেকেই কলেজের অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষক/কর্মচারীর বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু করেন তিনি। পুরো কলেজে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী। কলেজের অধ্যক্ষ শামসুর রহমান যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন সেজন্য সভাপতি প্রায় সময় অধ্যক্ষের সাথে গালিগালাজসহ রূঢ় আচরণ করতে থাকেন। সভাপতির এসব আচরণে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীরা প্রতিবাদ করলে তারাও তার প্রতিহিংসার টার্গেটে পড়ে হয়রানি হতে থাকেন। শিক্ষকরা জানান, কলেজের বর্তমান সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তেমনি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক পুর্ণিমা রানী বিশ্বাসের স্বামীও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। তবে তিনি বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের অপর গ্রুপ অর্থ্যাৎ উপজেলা চেয়ারম্যান নাজমুল হোসেন কাজলের অনুসারী। আর সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী স্থানীয় এমপি গ্রুপের লোক হিসেবে পরিচিত। যেকারণে শুধুমাত্র প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই পূর্ণিমা রানীকে চাকরিচ্যূত করতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেন সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী। তার নীতিবহির্ভূত এ কর্মকান্ডে সমর্থন না দেওয়ায় কলেজের অধ্যক্ষ শামসুর রহমানের বিরুদ্ধেও একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু করেন সভাপতি ও তার লোকজন।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক পূর্ণিমা রানী বিশ্বাসের স্বামী আজিজুর রহমান বলেন, সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারীর সাথে আমার দলীয় দ্বন্দ্ব থাকায় তিনি স্ত্রীকে নানা অজুহাত দেখিয়ে সাসপেন্ড করার ষড়যন্ত্র করে আসছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি আমি আমার স্ত্রীকে নিতে কলেজ গেটে গেলে সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী ও তার লোকজন আমাকে মারধর করে রক্তাক্ত করেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে আমি মামলাও করি। যা বিচারাধীন আছে। তিনি বলেন, বৈশি^ক করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও সভাপতি অধ্যক্ষকে বাদ রেখে আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগ দাঁড় করিয়ে সাময়িক বহিষ্কারের জন্য অন্যায়ভাবে সভা আহবান করেন। পরে বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হস্তক্ষেপে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে এ কারণে তিনি কলেজের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত আটকে দেন।
এলাকাবাসী জানান, কলেজের সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী এলাকায় দাঙ্গাবাজ হিসেবে পরিচিত। তার ভাই ইউপি চেয়ারম্যান দিলু পাটোয়ারীও প্রভাবশালী। যেকারণে তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে সব সময়ই তৎপর থাকেন। গত ৩০ মে সভাপতি ও তার লোকজন কলেজে গিয়ে গেট খুলে দেওয়ার জন্য কলেজের নৈশ প্রহরী রিপন হোসেনকে বলেন। এসময় নৈশ প্রহরী অধ্যক্ষের বিনা অনুমতিতে গেটের তালা খুলবেন না বলে ফেরত দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি পাশের প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে বসে মিটিং করে চলে যান। এর এক মাস পর কলেজের একটি নির্মিতব্য ভবনের লে-আউটের জন্য ঠিকাদাররা সেখানে আসেন। এ সময় ঠিকাদার ও তার লোকজন চলে যাওয়ার পরপরই সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী ও তার ভাই ইউপি চেয়ারম্যান দিলু পাটোয়ারীর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী কলেজে ঢুকে নৈশ প্রহরী শেখ রিপনকে মধ্যযুগীয় কায়দায় রক্তাক্ত জখম করেন। তার আর্তচিৎকারে তার বৃদ্ধ বাবা এগিয়ে আসলে তাকেও কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করা হয়। এসময় বৃদ্ধ বাবাকে উলঙ্গ করে নির্যাতন করে সন্ত্রাসীরা। পরে স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে কলেজের সভাপতির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন নৈশ প্রহরী রিপন হোসেন। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলেজের অধ্যক্ষসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দায়ের করেন সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারীর লোকজন।
অভিযোগে আরও জানা গেছে, হামলা নির্যাতন করেও ক্ষ্যান্ত হননি সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও শনিবার তিনি কলেজের অধ্যক্ষকে না জানিয়ে পরিচালনা পরিষদের এক সভা আহবান করেন। কলেজের অধ্যক্ষ ও কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনৈতিকভাবে পাশের প্রাইমারি স্কুলে বসে এ সভা করেন। অবশ্য খবর পেয়ে খাজুরা ফাঁড়ি পুলিশ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। পরে মিটিং বন্ধ করে চলে যান তারা। কলেজের অধ্যক্ষ মো. শামসুর রহমান বলেন, আমরা শিক্ষক-কর্মচারীরা এখন চরম হুমকির মধ্যে রয়েছি। একজন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদের সভাপতির একের পর এক অনিয়ম ও অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে কলেজের সুনাম বিনষ্ট হচ্ছে। তারা আমাকে হামলা-মামলা দিয়ে হয়রানি পর্যন্ত করছে। তিনি বলেন, খবির-উর রহমান কলেজ শুধু বাঘারপাড়ার নয়, যশোর জেলার একটি সুনাম ধন্য প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের যে ষড়যন্ত্র চলছে তা থেকে প্রতিকারে এখন আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এ বিষয়ে কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারীর সাথে যোগাযোগ যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।