ই-লোন: ঘরে বসেই ব্যাংক ঋণ, সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ — সুবিধা কতটুকু, ঝুঁকিই বা কোথায়?

0
. বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১১ মে ই-লোন সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করেছে; এখন থেকে দেশের যেকোনো ব্যাংক মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে।। প্রতীকী ছবি: এআই/লোকসমাজ

ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মানেই দীর্ঘ লাইন, স্তূপ কাগজপত্র আর বারবার শাখায় ছোটাছুটি — এই পরিচিত ভোগান্তির দিন বদলাতে এবার মাঠে নামছে ‘ই-লোন’ বা ডিজিটাল ঋণব্যবস্থা। মোবাইল ফোনের কয়েকটি ক্লিকেই আবেদন, যাচাই এবং ঋণের টাকা পাওয়ার এই ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে গত ১১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় একটি সার্কুলার জারি করেছে। এই নির্দেশনার ফলে এখন থেকে দেশের যেকোনো ব্যাংক ই-লোন সেবা দিতে পারবে।

ই-লোন আসলে কী?

ই-লোন হলো এমন একটি ঋণসেবা যেখানে আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হয়। গ্রাহককে সরাসরি শাখায় যেতে হয় না। ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিয়েই ঋণের আবেদন করা যাবে। ব্যাংক গ্রাহকের আর্থিক তথ্য, লেনদেনের ইতিহাস ও আয়ের বিবরণ বিশ্লেষণ করে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করছেন, ই-লোন কোনো নতুন ধরনের ঋণ নয়, বরং এটি ঋণ দেওয়ার একটি ডিজিটাল পদ্ধতি মাত্র। মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, “এটা ঋণের একটা প্রসেস, ক্যাটাগরি অব লোন না।” তার মতে, এসএমই বা কর্পোরেট যেমন ঋণের আলাদা শ্রেণি, ই-লোন তেমন কিছু নয়। মূলত কটেজ, মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ অর্থাৎ সিএমএসএমই ক্যাটাগরির মধ্যেই এই ঋণ ডিজিটালি দেওয়া হবে।

বাংলাদেশে কি এটি নতুন?

না। বাংলাদেশে ই-লোনের ধারণা আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। বিকাশ ও সিটি ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যে এই ধরনের ডিজিটাল ঋণসেবা চালু রয়েছে, যেখানে শুরুতে ২০ হাজার এবং পরে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। বেসিসের সাবেক সভাপতি ও বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, “এটা নতুন কিছু না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সার্কুলারের ফলে এখন যেকোনো ব্যাংক এটি করতে পারবে।” মোহাম্মদ নূরুল আমিনও বলেন, আগে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় কাজটি হতো, এখন সারা দেশের সব ব্যাংকের জন্য তা প্রযোজ্য হলো।

কী কী শর্তে ই-লোন পাওয়া যাবে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সেবার নাম বাধ্যতামূলকভাবে ‘ই-লোন’ রাখতে হবে। একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদে এই ঋণ নিতে পারবেন। সুদের হার বাজারভিত্তিক হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় ঋণ দেওয়া হলে সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ হবে।

ঋণের আবেদন থেকে অনুমোদন ও বিতরণ সম্পূর্ণ অনলাইনে হবে। কোনো কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে না — বায়োমেট্রিক তথ্য ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মাধ্যমে গ্রাহকের সম্মতি নেওয়া হবে। ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংক গ্রাহকের সিআইবি রিপোর্ট যাচাই করবে, তবে এ বাবদ ব্যাংক বা গ্রাহক কোনো চার্জ দেবেন না। ঋণখেলাপিরা এই সুবিধা পাবেন না।

সুবিধা কতটুকু?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যারা সাধারণত ব্যাংকে যান না বা যেতে পারেন না, এই উদ্যোগ তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। ফাহিম মাশরুর বলেন, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে চাকরিজীবীদেরই সাধারণত সুবিধা দেওয়া হয়, কিন্তু ই-লোনের ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেই আবেদন করা যাবে। ফলে প্রান্তিক মানুষ, শিক্ষার্থী ও ছোট ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পেতে পারবেন।

মোহাম্মদ নূরুল আমিন জানান, এনজিওর কাছে গেলে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি শোধ করতে হয়। সেই তুলনায় ই-লোনে ১২ মাসে মাত্র ৪-৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে, যা অনেক সাশ্রয়ী। বাংলাদেশ ব্যাংকও তার সার্কুলারে বলেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে ক্যাশলেস সমাজ গড়তে ই-লোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ঝুঁকি কোথায়?

তবে এই উদ্যোগে ঝুঁকিও আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফাহিম মাশরুর বলেন, ই-লোনে কোনো জামানত নেই। ব্যাংক ১০০ জনকে ঋণ দিলে ২০-২৫ জন ফেরত না দিলে ব্যাংকের ক্ষতি হবে। তার মতে, এই ঝুঁকি সামলাতে সুদের হারের সীমা বেঁধে না দেওয়াই ভালো হতো। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে এই ধরনের জামানতবিহীন ছোট ঋণে সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা হয়, কারণ এতে ব্যাংকের ঝুঁকি সামলানো সহজ হয়।

তবে মোহাম্মদ নূরুল আমিন মনে করেন, ঝুঁকি থাকলেও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তার ভাষায়, “ঝুঁকি থাকলেও সামনের দিকে আমাদের এদিকে যেতে হবে।”