মাসুদ রানা বাবু ॥ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘রাজনীতিকে মিছিল, মিটিং কিংবা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। আমরা রাজনীতিটাকে মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়ে যেতে চাই। ঝড়, বৃষ্টি, তুফান, বন্যা, প্রাকৃতিক কিংবা ব্যক্তিগত বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হচ্ছে বড় রাজনীতি।
আমরা সেই রাজনীতি করতে চাই। অতীতে আমরা দেখেছি রাজনীতির মঞ্চে একদল আরেক দলকে সমালোচনা ও দোষারোপ করছে। এই দোষারোপের রাজনীতি করলে মানুষের পেট ভরবে না। কী করলে মানুষের পেট ভরবে এবং তারা ভালো থাকবে, আমরা সেই কাজগুলো করতে চাই।
বহু বছর ধরে যে রাজনীতির শৈলী (স্টাইল) দেখেছি, এখন সেটাকে পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। আগামীতে জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে কথা একটাই, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’
যশোরে অ্যালবিনিজম রোগে আক্রান্ত হয়ে শরীরের রঙ অতি ফর্সা হওয়ায় পিতৃস্নেহ বঞ্চিত শিশু অফিফা ও তার মা মনিরা বেগমকে প্রতিশ্রুত নতুন ঘর হস্তান্তরকালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ কথা বলেন। তিনি ভার্চ্যুয়ালি এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
আফিফার মা মনিরা বেগমের অভিযোগ ছিল- জন্মের পর মেয়ের গায়ের রঙ অতি ফর্সা হওয়ায় তার পিতা দুর্ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে তিনি মেয়েকে নিয়ে স্বামীগৃহ ত্যাগ করে পিতার বাড়ি যশোর সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাজুয়াডাঙ্গা গ্রামে আশ্রয় নেন।
এ ঘটনা গতবছরের নভেম্বর মাসে দেশ জুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। গত ১৪ নভেম্বর বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম আফিফাকে দেখতে ও খোঁজ নিতে বাজুয়াডাঙ্গা গ্রামে যান।
সে সময় তিনি আফিফা ও তার মায়ের বসবাসের ছোট্ট কুটির দেখে তাদের একটি বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সে অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ শেষে সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে আফিয়া ও তার মাকে ঘর হস্তান্তর করা হয়। তারেক রহমানের পক্ষে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম আফিয়ার মা মনিরা খাতুনের হাতে ঘরের চাবি তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আসে, কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তারা অনেক কাজ করতে পারেনি। তারা সংস্কার নিয়ে কাজ করছে।
যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো এসেছে তা দেশ ও মানুষের জন্য ভালো। কিন্তু আজকে যে আফিয়া এবং তার মায়ের পাশে দাঁড়ালাম, আফিয়া এবং তার মায়ের মতো এমন অসংখ্য অসহায় মানুষ আছে। তাদের কথা চিন্তা করতে হবে, তারাও তো এই দেশের সন্তান। একটি রোগের কারণে আফিয়ার বাবা তাদের ছেড়ে গেছে। তাদের মতো গ্রামীণ জনপদের মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত।
আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে আমরা যদি সরকার গঠন করতে পারি, তাহলে আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম গ্রামীণ জনপদের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে আমরা এক লাখ প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে পল্লী চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল কাটা প্রকল্প চালু করেছিলেন, যার সুফল মানুষ পেয়েছিল। সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকরা যেমন সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তেমনি মানুষ পানির কষ্টে ভুগছে। মানুষ সেচের পানির জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন করেও পানি পাচ্ছে না।
আবার সীমান্তের ওপার থেকে যখন বাঁধ খুলে দেয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়। তাই আমরা আগামী দিনে খাল কাটা প্রকল্প আবার চালু করতে চাই, যা সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষের উপকারে আসবে।
দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কৃষকদের ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের সুদ এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেছিলেন। আমরা আগামী দিনে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তাদের পাশে শক্তভাবে দাঁড়াতে চাই যাতে করে তাদের সুবিধা দিতে পারি। কৃষক যদি ভালো থাকে, তবেই দেশ ভালো থাকবে। সেই জন্য কৃষককে সহযোগিতা করার জন্য আমরা কৃষি কার্ডের পরিকল্পনা নিয়েছি।’
বিএনপি নেতা বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে লেখাপড়া করার সুযোগ দিয়েছিলেন। তার সুফল দেশের মানুষ পেয়েছে। আমরা আগামী দিনে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চাই। তারা স্বাবলম্বী হলে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাবে। তাদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ করতে চাই, যে কার্ডের অর্থ দিয়ে তারা সাংসারিক ব্যয় নির্বাহ করতে পারবে।
আমরা মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের জন্য সম্মানী ভাতা দিতে চাই, যাতে করে তারা আত্মসম্মানের সাথে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারেন। প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপারে আমরা চিন্তা করেছি। আফিয়া এবং তার মায়ের মতো হাজার হাজার মানুষের পাশে আমরা দাঁড়াতে চাই।’
আফিয়া এবং তার মায়ের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বোন, আপনি একা নন। আপনাদের মতো যে অসহায় মা-বোনেরা আছেন, তাদের পাশে বিএনপি আছে। ইনশাআল্লাহ, আগামী দিনে সরকার গঠন করলে আরও দৃঢ়ভাবে আপনাদের পাশে থাকব। নারী সমাজকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও শপথ।’
আফিয়ার ঘর সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ায় তারেক রহমান অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘অমিত এত প্রতিকূলতার মাঝেও আফিয়া এবং তার মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ইনশাআল্লাহ, অমিতের মতো আরও নেতা এই দলে তৈরি করব যারা মানুষের বিপদে ও প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবে। আমরা যত বেশি এমন নেতা তৈরি করতে পারব, এই দল তত বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবে।’
আফিয়ার মা মনিরা খাতুন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমার এবং আমার মেয়ের থাকার জায়গা ছিল না। আমরা বাচ্চা নিয়ে চাচার বাড়ির এখানে-সেখানে রাত কাটাতাম। কিন্তু তারেক রহমান ভাই বাইরে থেকে আমার বিষয়টি দেখেছেন। তিনি আমাকে একটা ঘরের ব্যবস্থা করার জন্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ভাইকে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। তিনি এসে দেখেন আমার থাকার জায়গা নেই। তিনি (অনিন্দ্য ইসলাম অমিত) বলেছিলেন আমাকে একটা ঘর দেবেন। আমার বাচ্চার পড়াশোনার দায়-দায়িত্ব তারেক রহমান এবং তিনি নেবেন।’
এ সময় মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দলের সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রামনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ডা. আব্দুল আজিজ। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম, মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু, শহিদুল বারী রবু, সাবেক সহ-সভাপতি গোলাম রেজা দুলু, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইসহক, সাবেক সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য মিজানুর রহমান খান, দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত, নগর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌধুরী মুল্লুক চাঁদ, সাধারণ সম্পাদক এহসানুল হক সেতু, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনসারুল হক রানা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তফা আমির ফয়সাল, সদস্য সচিব রাজিদুর রহমান সাগর প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আঞ্জুরুল হক খোকন।





