দোকানে দোকানে লেখা ‘গ্যাস নেই’

0
ছবি: লোকসমাজ।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ভোরবেলা চুলায় আগুন জ্বালাতে পারেননি যশোর শহরতলীর জামরুলতলা এলাকার গৃহিণী রাজিয়া সুলতানা। খালি সিলিন্ডার হাতে নিয়ে বের হন গ্যাসের খোঁজে। এক দোকান, দুই দোকান ঘুরেও কোথাও মেলেনি এলপিজি।

কোথাও ঝুলছে ‘গ্যাস নেই’ লেখা নোটিশ, কোথাও আবার চড়া দামের কথা শুনে ফিরে আসতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই বিদ্যুতের চুলায় রান্না সেরেছেন।

রাজিয়ার অভিজ্ঞতা এখন যশোরের হাজারো পরিবারের দৈনন্দিন বাস্তবতা। জেলায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাজারে সেনা কল্যাণ সংস্থার সিলিন্ডার ছাড়া প্রায় সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কার্যত উধাও। অথচ কয়েক দিন আগেও অতিরিক্ত দামে সীমিত আকারে গ্যাস মিললেও গত তিন দিন ধরে অধিকাংশ ডিলার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়েও এখন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও যে অল্প কয়েকটি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম উঠেছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা পর্যন্ত। তবুও কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক দোকান তাই বাধ্য হয়ে ‘গ্যাস নেই’ লেখা নোটিশ টানিয়ে রেখেছে।

যশোরের এলপিজি ব্যবসায়ী মো. সাজ্জাদুল কাদের অর্ণব বলেন, ‘যমুনা, বসুন্ধরা, বেক্সিমকো ও ওমেরার মতো বড় কোম্পানিগুলো ১২ কেজির সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। দোকানগুলোতে আগে যে মজুত ছিল, তা ইতোমধ্যে শেষ। এখন শুধু সেনা কল্যাণ সংস্থার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তাও ১০০ পিস অর্ডারে মাত্র ১০ থেকে ১২টি করে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।’

আরেক ব্যবসায়ী মো. ইকরামুল ইসলাম জানান, চাহিদা থাকলেও সরবরাহ নেই। প্রতিদিন যে কয়েকটি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও সাড়ে ১৩শ থেকে ১৪শ টাকায় কিনতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ যোগ করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা যেমন লোকসানে পড়ছেন, তেমনি ক্রেতাদের ক্ষোভও সামলাতে হচ্ছে। অনেক সময় দোকানিদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।

এই সংকটের সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম হাঁকাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ী এস এম মোতালেবের মতে, প্রশাসনের নজরদারি না বাড়লে এই অনিয়ম আরও বিস্তার লাভ করবে।

এলপিজি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাসাবাড়ির রান্না, যানবাহন, রেস্তোরাঁ, অফিস, সবখানেই এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিকল্প জ্বালানি সহজলভ্য না হওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। যশোর শহরের বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম বলেন, আগেই সংসারের খরচ বেশি ছিল। এখন গ্যাসের জন্য অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে, তাও নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে বলে তিনি জানান।

সংকটে পড়েছে রেস্তোরাঁ ব্যবসাও। যশোর শহরের হোটেল ডাকুয়ার মালিক হানিফ ডাকুয়া জানান, তার হোটেলে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দিনে একটি সিলিন্ডারও পাওয়া যাচ্ছে না।

অনেক হোটেল বাধ্য হয়ে কাঠ বা খড়ির মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, এতে খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবেশ ও নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

এ বিষয়ে যশোর এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, জেলায় প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সরবরাহ নেমে এসেছে এক-পঞ্চমাংশে। গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দফায় দফায় দাম বাড়ানোর প্রভাবেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি সরকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে দাম ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২১৫ ও ১ হাজার ২৫৩ টাকা। মাত্র তিন মাসে দাম বেড়েছে ৯১ টাকা।

তবে আমদানিকারকরা বলছেন, সংকটের মূল কারণ দেশের বাইরে। এলপিজি শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, পরিবহন সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে।

এ বিষয়ে করিম গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল জানান, ইরান ও রাশিয়ার এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ায় বাংলাদেশে গ্যাস আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ কোম্পানির স্টোরেজে আমদানি করা গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় রেশনিংয়ের মাধ্যমে সীমিত সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।