বোমাবাজি, চুরি, মাদক ও যানজট নিয়ে যশোরে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় সমালোচনা

0

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ যশোরে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছে জেলা বিএনপি ও জামায়াত নেতারা। শুধু দুটি দল নয়, জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় অংশগ্রহণকারী প্রায় সব সদস্যই একই সুরে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেন।

রোববার সকালে জেলা কালেক্টরেট ভবনের অমিত্রাক্ষর সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আজহারুল ইসলাম।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে না এবং তাদের কাজের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি অভয়নগরে চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ বিঘ্ন নিয়ে আয়োজিত জামায়াতের এক সভাস্থলের বাইরে তিনটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাকে তারা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, ‘এত বড় ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কাউকে আটক করেনি, এমনকি দৃশ্যমান তৎপরতাও দেখায়নি।’

বিএনপির জেলা সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ অনেক সময় মামলা নিতে চায় না। জমিজমা সংক্রান্ত মামলায় দুই পক্ষকে থানায় ডেকে আপস-মীমাংসার নামে বাণিজ্য চলছে। যে পক্ষ বেশি টাকা দিচ্ছে, রায় তার পক্ষে যাচ্ছে।’

সভায় শহরে যানজট, মাদক বিস্তার ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, ‘যশোর শহর এখন শব্দদূষণে ভরে গেছে, চিকিৎসক থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি, সবজি বিক্রেতা সবাই মাইকিং করছে। অ্যাম্বুলেন্সের অতিরিক্ত সাইরেন, রিকশা ও ইজিবাইকের অবিরাম হর্নে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।’ তারা প্রশাসনের প্রতি দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

সভায় উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ২৪৯টি মামলা হয়েছে, যা আগের মাস আগস্টে ছিল ২৬৭টি এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ২১৪টি। এ সময় নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে ৩১টিতে দাঁড়িয়েছে (আগস্টে ২০টি ছিল)। সেপ্টেম্বর মাসে চুরির ঘটনাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬টিতে, যেখানে আগস্টে ছিল ১৯টি। সদস্যরা বলেন, চুরির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনাও প্রত্যাশার চেয়ে কম।

জেলা প্রশাসক মামলার জট নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ‘জেলায় চোরাচালান, মানবপাচার, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মামলার জট উদ্বেগজনক।’ তিনি দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার হলে অপরাধের সংখ্যা কমবে।’

সভায় জানানো হয়, গত মাসে খুলনা বিভাগের মধ্যে যশোরে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে বিভাগজুড়ে ৩৩টি দুর্ঘটনার মধ্যে যশোরে ঘটেছে ১০টি, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন। জেলা প্রশাসক এই পরিস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাকে দায়ী করেন। তবে প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন বলেন, ‘যশোরের রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা ও অতিরিক্ত যানবাহনের আধিক্যও বড় কারণ।’ কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি, ফুটপাথে অবৈধ দখল, মণিহার এলাকায় সড়ক দখল, খাজুরা স্ট্যান্ড ও বোর্ড অফিস থেকে মণিহার পর্যন্ত সড়কের বেহাল অবস্থাসহ নানা অনিয়ম নিয়ে সভায় আলোচনা হয়।

সভায় জেলা বিএনপির সভাপতি ও পিপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, জামায়াতের জেলা আমীর অধ্যাপক গোলাম রসুল, চেম্বার অব কমার্স সভাপতি মিজানুর রহমান খান, দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত, ডিডিএলজি ও পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইরুফা সুলতানা, এনএসআইয়ের যুগ্ম পরিচালক আবু তাহের মো. পারভেজ, প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।