ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া শহিদুল আলম আটক

0

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ গাজা অভিমুখে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত বাংলাদেশি আলোকচিত্রী, শিক্ষক এবং মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলমকে ইসরায়েলি বাহিনী আটক করেছে। তিনি যখন গাজা অভিমুখে যাওয়া ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, তখনই এই ঘটনা ঘটে।

এই আটকের প্রেক্ষিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দেশের সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

বুধবার বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী আটক করা হয়। টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ওই নৌবহরের জাহাজ এবং যাত্রীদের আটক করে ইসরায়েলি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গাজায় গণহত্যা চালানো ইসরায়েলের এই অপকর্মে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে বলে আটকের পর ২৫ সেকেন্ডের এক ভিডিও বার্তায় এ কথা বলেন শহিদুল আলম।

ওই ভিডিও বার্তায় শহিদুল আলম বলেন, ‘আমি শহিদুল আলম, বাংলাদেশের একজন আলোকচিত্রী ও লেখক। আপনারা এই ভিডিও দেখছেন মানে, আমরা সমুদ্রে আটক হয়েছি এবং ইসরায়েলের দখলদার বাহিনী আমাকে অপহরণ করেছে। গাজায় গণহত্যা চালানো ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি সক্রিয়ভাবে সহায়তা দিচ্ছে। আমি আমার সব সহযোদ্ধা ও বন্ধুদের প্রতি ফিলিস্তিনের মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাই।’

এর আগে মঙ্গলবার তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন, বুধবার ভোরে ‘রেড জোন’ বা বিপজ্জনক অঞ্চলে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রেড জোন বলতে তিনি বোঝান সেই এলাকায়, যেখানে সম্প্রতি ইসরায়েলি বাহিনী সুমুদ ফ্লোটিলা নৌবহর আটক করেছিল।

শহিদুল আলম লেখেন, ধীরগতির নৌযানগুলো যেন পেছনে না পড়ে তার জন্য নৌবহরের কিছু নৌযান সাময়িকভাবে ধীরগতিতে চলেছে। এরপর থাউজেন্ড ম্যাডলিনস নৌযানগুলোও তাদের সমকক্ষে এসেছে। বর্তমানে তাদের অবস্থান রেড জোন থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে।

এদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছে, গাজার বৈধ সামুদ্রিক অবরোধ ভাঙার আরেকটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। জাহাজ ও যাত্রীদের নিরাপদে বন্দরে আনা হয়েছে এবং তাদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

এর এক সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় ত্রাণ পৌঁছাতে যাওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামের ৪০টিরও বেশি জাহাজ আটক করেছিল। এটি ছিল গাজা অবরোধ ভাঙার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। সেই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন ৪৭৯ জন মানবাধিকারকর্মী, যাদের কয়েকদিন আটক রাখার পর বেশিরভাগকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

আটক অবস্থায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ওই ফ্লোটিলার বেশ কয়েকজন অংশগ্রহণকারী। তাদের দাবি, আটকাবস্থায় মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছিল।

শহিদুল আলমের অংশগ্রহণে এই সাম্প্রতিক ফ্লোটিলা আটক হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের মানবাধিকার ও সাংবাদিক সমাজ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং শহিদুল আলমের দ্রুত মুক্তি দাবি করছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বুধবার এক পোস্টে লিখেছেন, শহিদুল আলম যে নৌবহরে ছিলেন, ইসরায়েলি বাহিনী তা আটক করেছে। শহিদুল জানিয়েছেন, তারা এখন ‘ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর হাতে অপহৃত অবস্থায় আছেন।

এ বিষয়ে শফিকুল আলম বলেন, শহিদুল আলমের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, তবে একই সঙ্গে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার প্রতিও। এটি কেবল এক মানবিক বিপর্যয় নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক নৈতিক পরীক্ষাও।

শহিদুল আলমসহ নৌবহরের সব যাত্রীর অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান প্রেস সচিব। তার ভাষায়, ‘শহিদুল বাংলাদেশের অবিচল মানবিক চেতনার উজ্জ্বল প্রতীক।’

এদিকে, শহিদুল আলমের মুক্তি চেয়ে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে ফেসবুক বার্তা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শহিদুল আলমের মুক্তি চেয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, আমি সরকারকে শহিদুল আলমের নিরাপদে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

এর আগে, এক ভিডিও বার্তায় শহিদুল আলম বলেন, ‘আমি শহীদুল আলম, বাংলাদেশের একজন আলোকচিত্রী ও লেখক। আপনি যদি এই ভিডিওটি দেখে থাকেন, তাহলে এতক্ষণে আমাদের সমুদ্রে আটক করা হয়েছে। আমাকে ইসরায়েলের দখলদার বাহিনী অপহরণ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সহায়তায় গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। আমি আমার সকল বন্ধুদের ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক দল নাগরিক ঐক্য। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুমুদ ফ্লোটিলা ছিল একটি মানবিক সহায়তা বহনকারী শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিশন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গাজার চলমান মানবিক বিপর্যয়ের দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং অবরুদ্ধ জনগণের পাশে দাঁড়ানো। এমন একটি মানবিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ায় একজন শিল্পী ও মানবাধিকারের পক্ষে সক্রিয় নাগরিককে আটক করাকে মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা যায়।

সংগঠনটি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে শহিদুল আলমকে নিঃশর্ত ও নিরাপদ মুক্তি দিয়ে মর্যাদার সঙ্গে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে শহিদুল আলমের নিরাপত্তা এবং দ্রুত দেশে ফেরা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে নাগরিক ঐক্য।