অনলাইন জুয়ার বলি দুই যুবক যশোরে এক দিনে ৪ আত্মহত্যা

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ এক ভয়ংকর অনলাইন জুয়ার নেশা কেড়ে নিল দুটি তরতাজা প্রাণ। মাত্র একদিনের ব্যবধানে যশোরে দুই যুবক অনলাইন জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। একই দিনে আরও এক মেধাবী ছাত্রী ও ব্যবসায়ী আত্মহনন করেছেন।

চুড়ামনকাটি (যশোর) সংবাদদাতা জানান, অনলাইন জুয়া খেলায় হেরে গিয়ে যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের দৌলতদিহি গ্রামের হৃদয় দেব (১৮) নামের এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে। হৃদয় দেব দৌলতদিহি গ্রামের ইজিবাইক চালক বাসু দেবের ছেলে।

তার পরিবারের সদস্যরা জানান, হৃদয় দেব চুড়ামনকাটি বাজারের ইসমাইল হোসেনের ফার্মাসিতে কর্মচারীর কাজ করতেন। প্রতিদিনের মত তিনি সকালে বাড়ি থেকে বের হন দোকান খুলতে। পরে জানতে পারেন তাদের ছেলে হৃদয় দেব ফার্মাসির মধ্যে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, হৃদয় সম্প্রতি অনলাইনে জুয়া খেলায় আশক্ত হয়ে পড়েন। তাদের ধারণা অনলাইনে জুয়া খেলায় হেরে গিয়ে হৃদয় আত্মহত্যা করতে পারেন।

ফার্মাসির স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেন জানান, প্রতিনিয়ত সকাল বেলা দোকান খোলেন হৃদয় । মঙ্গলবার বেলা ১১ টা ২০ মিনিটের দিকে আমি দোকানে এসে দেখি দোকানের শাটার বন্ধ। এ সময় আমি শাটার তুলে দোকানের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি হৃদয়ের মরদেহ দোকানের ভেতর গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলছে। এ সময় আমার চেঁচামেচিতে আশেপাশের ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন। তবে কী কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন আমি তা বুঝতে পারছি না।

হৃদয়ের বাবা বাসুদেব জানান,সকালে নাস্তা করে হৃদয় দোকান খোলার কথা বলে বাড়ি হতে বের হন। এরপর তিনি জানতে পারেন তার ছেলে দোকানের মধ্যে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সাম্প্রতি তার ছেলে জুয়া খেলায় আশক্ত হয়ে পড়ে । তিনি মনে করেন অনলাইনে জুয়া খেলায় হেরে যাওয়ায় হৃদয় আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া তার ছেলের আত্মহত্যা করার মতো কোন কারণ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

খবর পেয়ে পুলিশ ময়না তদন্তের জন্যে লাশ উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
এ ব্যাপারে সাজিয়ালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই আব্দুর রউফ জানান, চুড়ামনকাটি বাজারে গলায় ফাঁস নিয়ে এক যুবক মারা গেছে এমন খবর পেয়েই আমি ঘটনাস্থলে হাজির হই। আমি লাশের প্রাথমিক সুরহাতাল রিপোর্ট তৈরি করে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করি।

স্টাফ রিপোর্টার, অভয়নগর (যশোর) জানান, নওয়াপাড়ায় মোবাইলে জুয়া খেলে টাকা খুইয়ে মনিরুজ্জামান (২৫) নামে মিলশ্রমিক সিলিং ফ্যানের সাথে রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জেজেআই মিলের আকিজ ইকোপ্যাকের আবাসিক এলাকায় । মৃত শ্রমিক কুড়িগ্রামের বুড়িঙ্গামারি উপজেলার কাশেমগঞ্জের জিলাই মন্ডলের ছেলে।

সকালে মুন্নি নামে দশ বছরের একটি মেয়ে মৃতদেহ সিলিং ফ্যানে ঝুলতে দেখে প্রতিবেশীদের খবর দেয়। প্রতিবেশীরা ঘরের দরজা ভেঙে মনিরুজ্জামানের মৃতদেহ উদ্ধার করেন।

মনিরুজ্জামানের স্ত্রী শাহিনা জানান, তিনি ও তার স্বামী মনিরুজ্জামান আকিজের ইকোপ্যাক মিলে ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তাদের মুন্নি নামে ৪ বছর বয়সের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে । স্বামী স্ত্রীর আয়ে তিনজনের সংসার সুখেই কাটছিল। হঠাৎ করে মনিরুজ্জামান মোবাইল ফোনে জুয়ায় খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েন। প্রায়ই তিনি জুয়া খেলে টাকা খুইয়ে আসছিলেন। নিজের কাছে টাকা না থাকলে জুয়া খেলার জন্যে স্ত্রীকে বিভিন্ন সময় টাকার জন্যে চাপ দিতেন তিনি। এ নিয়ে স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকতো।

ঘটনার আগের দিন সোমবার এ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া লাগে ও স্ত্রী শাহিনাকে মনিরুজ্জামান বেদম মারপিট করেন। শাহিনা তার মেয়েকে নিয়ে ওই দিন বিকেলে পাশের এক নিকট আত্মীয়ের বাসায় চলে যান। মঙ্গলবার খবর পেয়ে ছুটে এসে দেখেন তার স্বামী মারা গেছেন।

অভয়নগর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুল আলীম জানান, এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্যে যশোর মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এছাড়াও পৃথক দুটি মর্মান্তিক ঘটনায় একজন ব্যবসায়ী এবং এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। মানসিক অসুস্থতা এবং পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়াই তাদের এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ বলে জানা গেছে।
মৃত ব্যবসায়ী হলেন হাসানুজ্জামান তুষার (৩০)। তিনি যশোর শহরের হাজী আব্দুল করিম সড়কের চুরি পট্টি এলাকার মৃত আব্দুস সাত্তারের ছেলে। তার ভাই, শহরের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আনিছুজ্জামান পিন্টু জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তুষারের শয়নকক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পাওয়ায় তারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন, তুষার ফ্যানের সাথে রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আছেন।

তাৎক্ষণিকভাবে রশি কেটে তাকে নামিয়ে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মিঠুন কুমার দে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তুষারকে মৃত ঘোষণা করেন। ডা. মিঠুন কুমার দে জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে এবং এটি আত্মহত্যা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশের অনুমতি নিয়ে স্বজনরা লাশ বাড়িতে নিয়ে যান এবং জানাজা শেষে কারবালা কবরস্থানে দাফন করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসানুজ্জামান তুষার ইদানীং মানসিক রোগে ভুগছিলেন এবং মানসিক সমস্যার কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

অপরদিকে, এসএসসি পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত এ প্লাস না পাওয়ায় মেধাবী ছাত্রী দীপ্তি সাধুখাঁ (১৭) ঘাসপোড়া কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেছেন। দীপ্তি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খালি শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন এবং এই বছর এসএসসি পরীক্ষায় ‘এ মাইনাস’ পেয়েছেন। তিনি ওই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকারী ছিলেন এবং তার রোল নম্বর ছিল ১।

মৃতের স্বজনরা জানিয়েছেন, দীপ্তি পরীক্ষায় ‘এ প্লাস’ পাওয়ার আশা করেছিলেন, কিন্তু কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। গত রোববার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে তিনি ঘাসপোড়া কীটনাশক পান করেন। তাকে গুরুতর অবস্থায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দীপ্তি সাধুখাঁ মারা যান। দীপ্তি সাধুখাঁ ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার চতুরপুর গ্রামের কার্তিক চন্দ্র সাধুখাঁর কন্যা।