বাবা-মায়ের জুতা মুছে ‘গ্লোবাল ডে অব প্যারেন্টস’ পালন করলো যশোরের খুদে শিক্ষার্থীরা

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সাধারণত ফুল, উপহার বা মিষ্টি কথায় বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। কিন্তু এবার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য দেখা গেল যশোরে। নিজেদের বাবা-মায়ের দুই পায়ের জুতা নিজ হাতে মুছে ‘গ্লোবাল ডে অব প্যারেন্টস’ উদযাপন করলো যশোরের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ব্রাদার টিটোস হোমের খুদে শিক্ষার্থীরা। এই অনন্য আয়োজন শুধু উপস্থিত অভিভাবকদের নয়, গোটা শহরবাসীর মনে এক গভীর মুগ্ধতা ও চমকের সৃষ্টি করেছে।

রোববার বিকেল থেকেই যশোর শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে বাবা-মায়ের হাত ধরে আসতে থাকে উচ্ছ্বসিত খুদে শিক্ষার্থীরা। এরপর মিলনায়তনের মঞ্চে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান সন্তানদের বাবা-মায়েরা। শুরু হয় সেই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্ত। ছোট্ট ছোট্ট হাতে টিস্যু নিয়ে মঞ্চে উঠে প্রতিটি শিশু পরম মমতায় নিজ নিজ বাবা-মায়ের জুতা পরিষ্কার করে দেয়। এই অভাবনীয় দৃশ্যে মিলনায়তনে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা, যা কিছুক্ষণের মধ্যেই আবেগাপ¬ুত অভিভাবকদের চোখের জলে মিশে যায়। জুতা মোছার পর শিশুরা নিজেদের হাতে আঁকা বিশেষ শুভেচ্ছা কার্ড তুলে দেয় বাবা-মায়ের হাতে।

সন্তানদের এমন অভাবনীয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়ে অনেক অভিভাবকই আবেগাপ¬ুত হয়ে পড়েন। নাহিদা আক্তার নামে একজন অভিভাবক অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘আমার বাচ্চাটা নার্সারিতে পড়ে, একটু দুষ্টুমি করলে বকা দেই। আবার একটু পরেই আদর করি। আজ অনুষ্ঠানে আমার সন্তান যখন আমাকে ও তার বাবার জুতা পরিষ্কার করে দিচ্ছিলো, তখনই অঝরে চোখ বেয়ে জল ঝরতে শুরু করে।’

রফিকুল ইসলাম নামে আরেক অভিভাবক বলেন, ‘সন্তানের কাছ থেকে এমন ভালোবাসা পাবো, কখনো কল্পনা করিনি। শিশুরা ছোট থেকে যা শেখানো হবে, বড় হয়েও তারা তা অনুসরণ করবে। স্কুলের এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই।’

তানিয়া ইসলাম নামে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, ‘জীবনে প্রথম বন্ধু মা বাবা। জীবনের আলো তারা। জীবনের প্রতিটি স্মৃতিতে তাদের ছোঁয়া রয়েছে। মা-বাবার আদর ছাড়া দিনটা শুরু হয় না আমার। তারা আমার প্রথম শিক্ষক। সেই মা-বাবার জুতা মুছে পুরস্কার পেয়েছি, খুব ভালো লাগছে।’

এই হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যপট শুধু জুতা মোছাতেই শেষ হয়নি। ব্রাদার টিটোস হোমের শিক্ষকরা অভিভাবকদের পা মোছার পাশাপাশি শিশুদেরকে বাবা-মায়ের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা করা, মিথ্যা কথা না বলা এবং দুর্নীতি না করার শপথ বাক্য পাঠ করান।

‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার উৎসব’ শিরোনামে এই অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে শুরু হয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পর্ব। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক আজহারুল ইসলাম। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের এমন নৈতিক শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে, তবে মানবিকতার জায়গায়, নৈতিকতার জায়গায় আমরা অনেক পিছিয়ে। মনুষ্যত্বের জায়গায় দিন দিন আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এমন ধরনের উদ্যোগ থেকে শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু শিক্ষা পাবে, যা সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এবং মানবিকতা ও নৈতিকতার উন্নতি ঘটাবে।’

ব্রাদার টিটোস হোম এর অধ্যক্ষ আলী আযম টিটোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় কচি কণ্ঠের আসরের সভাপতি হেমায়েত হোসেন এবং জেলা কালচারাল অফিসার জসিম উদ্দিন। আলোচনা শেষে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পিতা-মাতাকে নিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে গান, অভিনয় ও কবিতা আবৃত্তি করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আলী আযম টিটো জানান,‘বিশেষ এই দিনে শ্রদ্ধা পাওয়ার প্রথম দাবিদার বাবা-মায়েরা। যদিও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রদর্শনের কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না।

বিশেষ এই দিনে শিশুদের মনে বাবা-মায়ের প্রতি অটুট ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জাগিয়ে তুলতেই আমরা এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছি।’