অনলাইন সেবা কম্পিউটারের দোকানেই গণ্ডিবদ্ধ

0

তহীদ মনি ॥ প্রযুক্তির গতি এখন অফুরন্ত। নিত্য নতুন অ্যাপস ও সেবা সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিচ্ছে। প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতে হাতে এখন স্মার্টফোন। কিন্তু স্মার্টফোন দিয়ে যশোরের বিশাল জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে পারছে না। থানায় জিডি, জন্মনিবন্ধন সনদ, ভর্তি, চাকরি, ইন্টারভিউ, স্কুল-কলেজের বেতন দেওয়া, এনআইডি, পাসপোর্ট সেবাসহ যেকোনো দরকারি কাজ বা আবেদন এখন অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়।

আর এসব কাজ করতে গেলেই ছুটতে হয় শহরের পোস্ট অফিসপাড়াসহ শহরের বিভিন্ন কম্পিউটার দোকানে। এসব দোকানে লেখা থাকে ‘চাকরি, ভর্তির আবেদন অনলাইন, জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্টের আবেদন করা হয়, এনআইডি সংশোধন করা হয়’ ইত্যাদি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহরের প্রায় প্রত্যেকের হাতে মোবাইল ফোন আছে। যুবকদের হাতে দামি ও লেটেস্ট মডেলের ফোন। আজকাল ১০-১২ হাজার টাকা হলেই স্মার্টফোন পাওয়া যায়। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে গেছে এ ধরনের ফোন। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়, চাকরি খুঁজছে, পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্ম নিবন্ধন করাতে চায়, তাদের বেশিরভাগ মানুষের হাতেও স্মার্টফোন। ওয়াই-ফাই, ইন্টারনেট কানেকশনও এখন সহজলভ্য।

অল্প টাকায় ইন্টারনেট কিনে দিনরাত ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে কথা ও ছবি-তথ্য আদান-প্রদানও চলছে। দেশের মধ্যে অথবা বিদেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলেও কথা বলা যায়। মাসে মাসে ব্র্যান্ড ও ভার্সন বদলায়, অথচ তারাও অনলাইনে সরকারি-বেসরকারি সেবা পেতে বা আবেদন করতে কম্পিউটারের দোকানে ছুটে যান। সকল প্রযুক্তির গতিই যেন থমকে আছে কম্পিউটারের দোকানে।

স্মার্টফোনধারী বেশিরভাগ মানুষ ই-মেইল করতে পারেন না। এমন যুবকের সংখ্যাও অনেক বেশি। অনলাইন আবেদন ফরম পূরণ, থানায় জিডি কিংবা পরীক্ষার ফল দেখতে মোবাইল ফোনের দোকানের ওপর নির্ভর করেন ছেলে-বুড়ো সবাই।

তারা নিজেদের জন্য ফেসবুক, টিকটক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউবের বাইরে মোবাইলের ব্যবহার তেমন একটা করেন না বললেই চলে। অনলাইনকেন্দ্রিক যেকোনো প্রয়োজনে কম্পিউটার দোকানীদের চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই তাদের কাছে।

তাই প্রযুক্তি বাড়লেও সেবা গ্রহণ করতে দোকানে ধর্না দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে কম্পিউটারের দোকানগুলোতেই গড়ে উঠছে বিভিন্নভাবে দালাল চক্র। থানা, পাসপোর্ট অফিস, কোর্ট, বিআরটিএ সেবা নিতে ডিজিটাল দালালের দরকার হয়। দালাল থেকে মুক্তি নেই। প্রযুক্তি গতি বাড়ানোর চেয়ে যেন থমকে দিচ্ছে।

তবে এর সব দায় নিজেরা নিতে আগ্রহী নয় যুবসমাজ। মোবাইল স্মার্ট হয়েছে বটে, তবে সেবার যে অ্যাপসগুলো সরকারিভাবে দেওয়া হয়, সেখানে কাজ করার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ভুক্তভোগীসহ সংশি¬ষ্টদের দাবি, ছোট স্ক্রিনে সব পেজ, ক্যাপচা, সনদ সংযোজন, স্ক্যানিং করে ব্যবহার করা, ছবির রেজুলেশন ঠিক করা বা সাইজ ও মাপ সঠিক করার জটিলতা রয়েছে। চাকরিপ্রার্থী, বিসিএস আবেদনকারী, ভর্তির আবেদনকারী কয়েকজনের সঙ্গে যশোর পোস্ট অফিসপাড়ার দোকানগুলোতে কথা হয়। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির আবেদনকারী তামান্না জেসমিন জানিয়েছিলেন, স্মার্টফোনে সব পেজ ঠিকমতো আসে না, পূরণ করার ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে, ছবি সংযোজন ও মাপ ঠিক হয় না। প্রায় অনুরূপ উত্তর দিয়েছিলেন বিসিএস আবেদনকারী আব্দুল হালিম। তিনি জানিয়েছিলেন, অনেকগুলো পেজে কাজ করতে হয়। একটি পেজের তথ্য পূরণ করে পরের পেজে যেতে হয়। সব ওইটুকু স্ক্রিনে দেখা যায় না ঠিকমতো।

এতে যেমন ভুলের আশঙ্কা বেশি থাকে, তেমনি সনদ সংযোজনে নির্দিষ্ট সাইজ ও মাপ ঠিক রাখা কঠিন। এর চেয়ে কম্পিউটারের দোকানে বড় স্ক্রিন ও স্ক্যানিং সহজ। ভুলের আশঙ্কা কম থাকে। দোকানে যারা কাজ করেন, তারা প্রতিদিন অনেকগুলি কাজ করে অভ্যস্ত, সহজে সঠিক স্থান ও ফরম খুঁজে পান। এনআইডি সংশোধনকারী সামিউর রহমান বলেন, তার পিতার নামের বানানে ভুল ছিল। মোবাইলে গিয়ে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়, কোড আসে আরও যেসব তথ্য চায়, তার সবকিছু ভালোভাবে বোঝা যায় না। এরপর সনদ সংযোজনের কাজ থাকে। একদিন চেষ্টা করেও পারেননি, তাই দোকানে এলেন। এখানে তারা আধাঘণ্টায় তার কাজ করে দিয়েছে।

শ্রেয়ান কম্পিউটারের উৎপল মলি¬ক জানান, তারা প্রতিদিন বিভিন্ন অনলাইন আবেদন করে থাকেন এবং কাজগুলো তাদের জন্য খুবই সহজ। তবে আবেদন প্রার্থীদের জন্য ততটা সহজ হয় না। বেশিরভাগ অনলাইন আবেদনের যে অ্যাপস বা পদ্ধতি, তা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় কম্পিউটারে অথবা ল্যাপটপে। সাধারণত মোবাাইলের ব্যবহার পারলেও কম্পিউটারের ব্যবহার পারে না। দেখা যায় কম্পিউটারে কম্পোজ পারলেও ফটোশপের কাজ পারে না। অনেকে আছে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে পারলেও কম্পিউটারে পারে না। কম্পিউটার দক্ষতার অভাবে দোকানের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

সুজা কম্পিউটারের মালিক ওয়াসিম আলী আনছারি জানান, যশোর শহরকেন্দ্রিক দেড় শতাধিক কম্পিউটারের দোকান আছে, যারা মূলত অনলাইনভিত্তিক আবেদন সংশি¬ষ্ট কাজ করে তাদের সংসার চালান, কর্মসংস্থান করে চলেন। এর মূল কারণ মোবাইলে আবেদনের সব ভার্সন পাওয়া যায় না।

কম্পিউটারে দক্ষ লোকের সংখ্যা কম। তাছাড়া বেশিরভাগ অ্যাপস ইউজার ফ্রেন্ডলি না হওয়ায় সেবামূলক কাজে ফরম পূরণ বা আবেদনে ভুল হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। তাই মানুষ রিস্ক নিতে চায় না। স্বল্প সময়ে সামান্য খরচে দ্রুত আবেদন বা ফরম পূরণে সক্ষম হয়। সাধারণত লেখা এক ফরমেটে যেমন করতে হয়, ছবির কাজ আবার অন্য অ্যাপসে করতে হয়, সনদ স্ক্যানিং, সিগনেচার সংযোজন এসব কাজ জানা না থাকলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দোকানে যারা কাজ করেন, তারা প্রতিদিনই এই কাজে যুক্ত, তাই অভিজ্ঞতাও বেশি। তিনি স্বীকার করেন, অনেক দোকানের সঙ্গে হয়তো পাসপোর্ট অফিস বা বিআরটিএর লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়, হয়তো কেউ কেউ কাজে সহযোগিতার বিনিময়ে বাড়তি অর্থও নেয়।

যশোর জেলা নির্বাচন অফিসের সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম রাকিব বলেন, বর্তমানে নির্বাচন অফিসে এনআইডি আবেদন বা সংশোধন যায় বলেন, সবই অনলাইনে করতে হয়। তিনিও শুনেছেন বেশিরভাগ মানুষ কম্পিউটারের দোকান থেকেই কাজ শেষ করেন। এর কারণ হিসেবে তার মতে, মোবাইলে সব কাজ যেমন সুন্দর ও গুছিয়ে দ্রুত করা যায় না, তেমনি সহজও হয় না। তার মতে, কম্পিউটার বা ল্যাপটপে এটি ভালো হয়। আর দোকানে দালাল থাকে কিনা তা তিনি জানেন না। তবে বিভিন্ন সময় পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছেন, পাসপোর্ট বা বিআরটিএর কাজে দালালদের দৌরাত্ম্য থাকে।

যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ও উপসহকারী পরিচালক সুশান্ত কুমার জানান, বর্তমানে পাসপোর্ট সংক্রান্ত সব কাজ যে কেউ অনলাইনে নিজেরাই করতে পারেন। কম্পিটার জ্ঞান ভালো না থাকলে এটা সম্ভব হয় না। তাছাড়া মোবাইল ফোনে কাজ করতে কিছুটা সমস্যা হয়তো হয়।

ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে হার্ড কপি অফিসে আনলে পরবর্তীতে তার ছবি ওঠানো ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। এখানে দালাল ধরার দরকার হয় না। তবে মানুষ আবেদনগুলো কম্পিউটারের দোকান থেকে করে বলে তিনি জানান, কেন করেন তা তিনি জানেন না।