যশোরে ৭শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হতে চলেছে, ৫শ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

0

বি এম আসাদ ॥ যশোরে নির্মাণ হতে যাচ্ছে প্রায় ৭শ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক মানের ১০ তলা বিশিষ্ট ৫শ শয্যার যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালটি চালু হলে বৃহত্তর যশোর জেলার প্রায় ২ কোটি মানুষ উপকৃত হবে। যশোর গণপূর্ত সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে সব অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। কমিটিও রয়েছে, এখান থেকে পাস হলেই টেন্ডারের মাধ্যমে দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে।

যশোর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেল কলেজে জমির পরিমাণ হচ্ছে ২৫ একর। এই জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে হাসপাতাল। একটি বেজমেন্টসহ ১০ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। ভবনের বেজমেন্টে থাকবে ১০৪টি কার পার্কিং এবং আসবাবপত্রের স্টোর সুবিধা। নিচতলায় জরুরি বিভাগ, মরচ্যুয়ারি বর্হিবিভাগ, ২য়তলায় ক্যাফেটোরিয়া, রেডিওলোজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের আওতায় সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, এমআরআই আল্ট্রাসাউন্ড সুবিধ। এ হাসপাতাল ভবনে থাকছে ১১ টি অপারেশন থিয়েটারের সমন্বয়ে ওটি কমপ্লেক্স কাম রিকভারি ইউনিট। কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট (আইসিইউ), উচ্চ নির্ভরতা ইউনিট ( এইচডিইউ), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)। ৪১৭ টি ওয়ার্ড ও ৪০ টি কেবিন থাকছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

এছাড়া অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে, প্রশাসনিক ব্লক, ডে-হসপিটাল, ফার্মেসি , লন্ড্রি, সেন্ট্রাল স্টেরাইল, সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট (সিএসএসও) ও স্টোরেজসহ আনুষাঙ্গিক সুবিধা। এ হাসপাতাল নির্মাণ এবং চিকিৎসার সকল উপকরণ ক্রয় বাবদ মোট টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৬৭ কোটি টাকা। এর ভেতর হাসপাতাল ভবন নির্মাণে ব্যয় হবে ২৫২ কোটি টাকা। বাকি টাকা হাসপাতালের চিকিৎসা উপকরণ ( যন্ত্রপাতি) ও আসবাবপত্র ক্রয় করা হবে। কিছু টাকা দিয়ে মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ও ছাত্রদের তৃতীয় তলা বিশিষ্ট আবাসিক হোস্টেল ৬ তলা পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ করা হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতাল ভবন নির্মাণ এবং হাসপাতাল চালু করা পর্যন্ত কত টাকা এখনো পার্সেজ কমিটিতে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। পার্সেজ কমিটি দ্রুত অনুমোদন দিবে। এরপর টেন্ডার আহ্বান করা হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে টেন্ডার আহবানের মধ্য দিয়ে নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে যশোর গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে যশোর গণপূর্ত সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি

বলেন, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণ হবে। যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলাম এ বিষয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন। অর্থ সব বরাদ্দ হয়েছে। কমিটি রয়েছে। কমিটি থেকে পাস হলেই টেন্ডারের মাধ্যমে দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে। পার্সেজ কমিটিতে পাস হতে বেশি সময় লাগে না জানিয়ে মো. জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, এ হাসপাতালটি নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হবে। এটা এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের ব্যাপার বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ হোক এটি ছিল যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। ২০০৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নোয়াখালী, দিনাজপুর সহ দেশের ৫ জেলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিষয়টি মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছিল।

এরমধ্যে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছিল একটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, একাধিকবারের নির্বাচিত সাবেক মন্ত্রী যশোর উন্নয়নের কারিগর সকলের শ্রদ্ধেয় প্রয়াত তরিকুল ইসলাম ২০০৬ সালের শেষের দিকে এটির উদ্বোধন করেন। সে সময় ২৮৭ কোটি টাকাও বরাদ্দ করা হয়েছিল। জায়গাও নির্ধারণ করেছিলেন সাবেক মন্ত্রী সকলের শ্রদ্ধেয় তরিকুল ইসলাম।

এই অবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালে সরকার পরিবর্তন হয়। আসীন হয় সেনাশাসিত ফখরুদ্দিন মইনউদ্দিন সরকার। ওই সময় যশোর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ৮৭ কোটি টাকা এডিবিতে পাস হয়। এরপর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থানান্তরের জন্য ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তরিকুল ইসলামের প্রচেষ্টায় যশোর মেডিকেল কলেজ বিধায় তখন নানান কৌশলে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাতিল করে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার হীন চক্রান্ত করে তৎকালীন সরকারের ক্ষমতাধররা। তবে যশোরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে হীন চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।

তবে মেডিকেল কলেজ নির্মাণের টাকা বরাদ্দ হলেও হাসপাতাল ভবন বর্তমানে জন্য কোনো টাকা ছাড় করা হয়নি। পরে তৎকালীন সরকার ভারত সরকারের আনুকূল্যে এদেশে ৫ টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। নানা শর্তের বেড়াজালে ভারত সরকার বা সে দেশের কোম্পানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থার মধ্যে পড়ে দেরি হয়ে যায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের কাজ। এর আগে নির্মাণ হয় মেডিকেল কলেজ ভবন। যে ভবনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রয়েছে।

২০০৯ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর ২০১০ সালে যশোর মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটের ২য় তলায়। পরবর্তীতে তা স্থানান্তর করা হয় বর্তমান মেডিকেল কলেজের নিজ ভবনে। সেই থেকে যশোর মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে চলতি ২০২৫ দীর্ঘ ১২ বছর যশোর মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল ভবন এখনো নির্মাণ হয়নি। ফলে শুরু হয়নি চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। যশোর ২৫০শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালকে অস্থায়ীভাবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করছে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু হাসপাতাল স্থাপন করেনি।

উল্লেখ্য,যশোর মেডিকেল কলেজ হচ্ছে, যশোর উন্নয়নের কারিগর মরহুম জননেতা তরিকুল ইসলামের অবদান। যেমনটি স্থাপন করেছিলেন যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, যশোর করোনারি ইউনিটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যশোরকে স্বাস্থ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তার ছিল এই প্রয়াস।