দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও ক্ষোভের আগুনে ধুলিস্যাৎ ফ্যাসিস্টের চিহ্ন

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পলাতক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার খবরে দেশ জুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও জনতার মাঝে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় তার বহিপ্রকাশ গতপরশু বুধবার রাত থেকে দেখা যায়। রাজধানীতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের অন্যান্য স্থানেও তা ছড়িয়ে পড়ে। খুলনায় ভাঙা হয়েছে শেখ বাড়ি নামে পরিচিত কুখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হেলাল পরিবারের বাড়ি। এছাড়া যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিভিন্ন স্থাপনা ও নাম ফলক ভেঙে দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালসহ বিভিন্ন প্রতিকৃতি।
যশোর : বুধবার রাতে যশোর শহরের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে শেখ মুজিবুরের ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরের বকুলতলা এলাকায় স্থাপিত দেশের সর্ববৃহৎ ম্যুরালটিও বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতুড়ি-শাবল ও একটি বুলডোজার দিয়ে ম্যুরালটি ভাঙচুর করা হয়।
বুধবার রাতে যশোর পৌরসভা ক্যাম্পাসের শেখ মুজিবর রহমানের আবক্ষ ভাস্কর্য, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল, জেলা পরিষদের ভেতরের ম্যুরাল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেখ হাসিনার নাম ফলক, মনিহার বিজয় স্তম্ভের প্রাচীরে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের টেরাকোটা ভাঙচুর করে। সেখান থেকে বিক্ষুব্ধ জনতা সদর উপজেলা পরিষদের ভেতরে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেয়। এছাড়া অভয়নগর, ঝিকরগাছা, কেশবপুরে উপজেলা পরিষদের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে। প্রায় সারারাত ধরে এ ভাঙচুরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ছাড়াও সাধারণ মানুষরা অংশ নেয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরের বকুলতলায় শেখ মুজিবুরের স্মৃতিতে নির্মিত ম্যুরালটি ভাঙচুর করার সময় উপস্থিত ইসলামী ছাত্র মজলিসের নেতৃবৃন্দ ঘোষণা দেন ম্যুরাল স্থানে নির্মিত হবে ‘২৪ গণঅভ্যুত্থানে’ নিহত যশোরের দুই শহীদের নামে ম্যুরাল।

বুধবার রাতে যশোর জেলা পরিষদ চত্বরে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়

ভাঙচুর চলাকালীন ম্যুরাল চত্বরে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী নানা স্লোগান দিচ্ছেল ছাত্র জনতা। একই সাথে বাজানো হচ্ছিলো প্রতিবাদী গান। ভাংচুর চলাকালীন ম্যুরাল প্রাঙ্গনে উৎসুক জনতার ভিড় লক্ষ্য করা যায়। যদিও গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন ম্যুরালটি আংশিক ভাংচুর করে ম্যুরালে ইসলামিক গ্রাফিতি সেঁটে দেন বিক্ষুদ্ধ ছাত্র জনতা।
ইসলামী ছাত্র মজলিসের যশোর শহরের সেক্রেটারি আবু দারদা নাঈম বলেন, শেখ মুজিবর রহমান এই বাংলাদেশের শত্রু ছিলো। বাবার মতো মেয়েও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছে। আমরা শেখ হাসিনাকে উৎখাত করেছি। আমরা চায় না, এই মাটিতে আওয়ামী লীগ টিকে থাকবে। আমরা আওয়ামী লীগকে উৎখাত করেছি, এই জাতির সামনে আওয়ামী লীগ আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। সেই বিষয়টি লক্ষ করে আমরা অনেকদিন ধরে চেষ্টা করেছি, যশোরে এই ম্যুরালটি গুড়িয়ে দিতে। আজ যশোর পৌরসভাতে যেয়ে একটি বুলডোজরের আবেদন করেছিলাম। তারা আমাদের আবেদনের পেক্ষিতে বুলডোজর দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই স্থানে শিক্ষার্থীদের অর্থায়নে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহত যশোরের দুইজন শহীদ ইমতিয়াজ আহমেদ জাবির আর শহীদ আবদুল্লাহ নামে স্মৃতি ম্যুরাল নির্মাণ করা হবে।
১৬ ফুট উচ্চতার এ ম্যুরালটি ২০১২ সালের শেষের দিকে ২৯ লাখ ৯ হাজার ৯৫ টাকা নির্মিত করা হয়। জনশ্রুতি আছে এটি যশোরের ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষরে অনুদান থেকে সংগৃহীত টাকা দিয়ে নির্মাণের কথা বলা হলেও এটি বাস্তবায়ন করতে সে সময়য়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ব্যাপক চাঁদাবাজি করেন। এটি ছিল দেশের প্রথম বৃহৎ ম্যুরাল।
স্টাফ রিপোর্টার, কেশবপুর (যশোর) জানান, বিক্ষুব্ধ জনতা বুধবার মধ্যরাতে কেশবপুরের বিভিন্ন স্থানের ফ্যাসিস্ট সরকারের চিহ্ন ধ্বংস করেছে। বুধবার রাত বারোটার দিকে কেশবপুর বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের পক্ষে পৌর শহরের মাইকেল রোডের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে শেখ মুজিবের ম্যুরাল, পাঁজিয়া রোডের আওয়ামী লীগের অফিসের পাশের শেখ মুজিবের ম্যুরাল ও কেশবপুর পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের অডিটোরিয়ামের সামনে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এইস কে সাদেকের মূর্তি ভাঙচুর করা হয়।
কালিগঞ্জ (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা জানান, দেশের বৃহত্তম ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে শেখ মুজিব টাওয়ারের ম্যুরাল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭ টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা বারোবাজারের শমশেরনগরে গিয়ে ওই ভাঙচুর চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানায়, উপজেলার কাষ্ঠভাঙ্গা ইউনিয়নের সমশেরনগর গ্রামে কয়েক বছর আগে দেশের বৃহত্তম ১২৩ ফুট উচ্চতায় শেখ মুজিবের নামে একটি টাওয়ার তৈরি করা হয়। যার নাম দেয়া হয়েছিল স্টাটুচ অফ ফ্রিডম। ওই গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ শমসের এটি তৈরি করেছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতা মিছিল সহকারে ওই স্থানে গিয়ে শেখ মুজিবের মোরাল ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। এরপর ওই ভাংচুরকৃত মুরাল গুলি বারবাজার শহরে এনে সড়কের উপরে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয় ।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝিনাইদহ জেলা কমিটির অন্যতম সমন্বয় হোসাইন আহমেদ বলেন, খুনি শেখ হাসিনার পরিবারের কোন মুরাল স্থাপনা এ দেশে থাকবে না। বাংলার জমিনে কোন ফ্যাসিবাদের চিহ্ন থাকবে না। এজন্য তারা শেখ মুজিবের ওই মুরাল গুলি ভেঙে পুড়িয়ে দিয়েছে। এ সময় তাদের সাথে শত শত ছাত্র জনতা অংশ নেয়।

রিফাত রহমান,চুয়াডাঙ্গা থেকে জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পালিয়ে ভারতে অবস্থান নেওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ‘২৪-এর বিপ্লবী ছাত্রজনতা’ শীর্ষক একটি ব্যানার থেকে ‘বুলডোজার মিছিলের’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয় চুয়াডাঙ্গায়। প্রতিবাদকারীরা ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও, ফ্যাসিবাদের আস্তানা’ দিল্লি না ঢাকা,ঢাকা ঢাকা এমন নানা স্লোগানে চুয়াডাঙ্গা শহর প্রকম্পিত করে তোলে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা।
বুধবার রাত সাড়ে ১১ টায় চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিরোধী ম্লোগান দিয়ে প্রথমে জেলা কালেক্টরেট ভবনের সামনে শেখ মুজিব ও ফজিলাতুন্নেছার ম্যুরাল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয় ভাঙচুর করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রজনতা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এ সময় উপস্থিত ছিল সদর থানা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ও গণমাধ্যম কর্মীরা।