৩০ টাকা কেজি ধুলো চালও কিনতে পারছে না দরিদ্ররা অভাবি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে

0

 

হাবিবুর রহমান রিপন ।। যশোর শহরের বারান্দীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ মনোয়ারা বেগম(ছন্দনাম) বড় বাজারে খুঁজে ফিরছেন ধুলো চাল(ময়লা মিশ্রিত চাল)। খুঁজতে খুঁজতে চাল বাজারের মা লক্ষ্মী ভান্ডারে পেয়েও যান। ৩০টাকা কেজি দরের ধুলো মিশ্রিত চাল বিক্রি করতে দোকানি শর্ত দেন তার কাছে ৭/৮ কেজি যা আছে সব নিতে হবে। কিন্তু ক্রেতা মনোয়ারার সামর্থ ছিল মাত্র এক কেজি কেনার। দোকানি ৫০ টাকা কেজি দরের মোটা চাল কেনার পরামর্শ দিলেও তা তার সাধ্যের বাইরে ছিল। ফলে চাল কিনতে না পেরে মলিন মুখে ফিরছিলেন মনোয়ারা। দোকানি ডেকে এক মুষ্টি চাল হাতে ধরিয়ে বললেন, ‘চাল চাবায়ে পানি খেয়ে নিও।’
শুধু মনোয়ারা নন, তার মেয়েও ধুলো চাল খুঁজে গেছেন বলে জানান দোকানের কর্মচারী। দোকানির সাথে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহের দু একদিন এমন ক্রেতা তারা পাচ্ছেন। দোকান ঝাড়– দেয়ার পর দোকানের ময়লার সাথে কিছু চালও থাকে। এ চাল হাঁস মুরগির খাওয়ানোর জন্য মানুষ কিনতো কিন্তু ইদানিং নিজেদের খাওয়ার জন্য খুঁজছে।
মনোয়ারা বেগম লজ্জায় নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে চাননি। শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে ছিলেন। তাদের মত অনেকের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরাই অবস্থা’। লোক-লজ্জায় বলতে না পারা পরিবারগুলো আর্থিক সংকট আড়াল করার পথ পাচ্ছে না। আবার সংকট কাটিয়েও উঠতে পারছে না।
সবজি ব্যবসায়ী রাজিব হোসেন জানান, ৫ টাকা কেজি সবজি বিক্রি করে ২ টাকাও লাভ করা যায় না। সারাদিন মণ মণ সবজি বিক্রি করছি। আমাদের দোকান ভাড়াও টিকছে না। আগে যেখানে মাসে ২০/২৫ হাজার টাকা আয় হতো এখন সস্তার বাজারে ৫ হাজার টাকাও আয় হচ্ছে না। সব সবজি বিক্রেতা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ছেন। এভাবে দুই এক মাস চলছে অনেকের দেনা হয়ে যাবে।
কাঠেরপুল এলাকার মুদি ব্যবসায়ী মানবেন্দ্র জানান, কোম্পানিগুলোর শর্তের জালে তারা ব্যবসা করতে পারছেন না। একে তো জিনিসের দাম বেশি, বেচাবিক্রি কম, তার উপর কোম্পানিগুলো তেল কিনতে গেলে চালের শর্ত দিচ্ছে। ২ লিটার তেলের সাথে ২ কেজি চাল কেনা বাধ্যতামূলক। এভাবে একটার সাথে আর একটা জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু খুচরা বিক্রির সময় তেলের ক্রেতার কাছে চাল বিক্রি করা যাচ্ছে না। ফলে লাভের হিসেব দোকানেই পড়ে থাকছে। দোকানিদের পুঁজি বসে যাচ্ছে। উত্তোরণের কোন পথ নেই।
বেসরকারি চাকরিজীবী মাসুদুর রহমান জানান, বর্তমানে মাসিক ২০ হাজার টাকা আয়েও ৩ জনের সংসার চালানো যাচ্ছে না। কিন্তু বেসরকারি অনেক চাকরিজীবী আছেন যাদের বেতন ১০ হাজার টাকারও কম। তাদের সঞ্চয় শেষ, ধারদেনার জায়গাও নেই।
অপর এক বেসরকারি চাকরিজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, যে গতিতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, সে গতিতে তো বেতন বাড়েনি। এমনও বেসরকারি চাকরিজীবী আছেন যাদের বেতন কয়েক বছরেও বাড়ে না। বাজার করতে গিয়ে তাদের দুর্গতি অবর্ণনীয়।
চা দোকানী জাহিদুর রহমান জানান, তার দোকানে এমন ক্রেতাও আসেন যারা সকাল থেকে না খেয়ে দুপুরে ৫ টাকার পাউরুটি ও ৫টাকার চা খেয়ে দিন পার করে দেন।
এর বাইরে যারা হাত পেতে নিতে পারেন তাদের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। শহরের কোন রাস্তার উপর ২/৩জন জড়ো হলেই হাজির হচ্ছেন ভিক্ষুক। চায়ের দোকানে, হাটে, মার্কেটে, হাসপাতালে, মসজিদে, পার্কে, সর্বত্র ভিক্ষুকের উপস্থিতি বিব্রত করছে মানুষকে।
অথচ ২০১৭ সালের ১৩ জুন যশোর পৌরসভাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার আগে ৫ লাখ ভিক্ষুককে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করার জন্য হাঁস, মুরগি, রিকশা ভ্যান, সেলাই মেশিন, কাঁচামাল, শাড়ি লুঙ্গি ও নগদ টাকা। এসব সামগ্রী গ্রহণের সময় ভিক্ষুকরা শপথ করেছিলেন তারা আর ভিক্ষা করবেন না । এর আগে ২০১৭ সালের ১৬এপ্রিল যশোর সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ভিক্ষুক মুক্ত ঘোষণা করেন তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুস সাত্তার।
যশোর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র জানা যায়, ২০১৭ সালে জেলার ৮টি উপজেলায় ভিক্ষুকদের বিভিন্নভাবে পুনর্বাসন সামগ্রী, সেলাই মেশিন, ভ্যান-রিকশা, হাঁসমুরগি, মুদি দোকান, পুরাতন কাপড় বিক্রি, ডিম বিক্রি, কাঁচামালের ব্যবসা, পিঠা তৈরি, ওজন মাপা মেশিন, ঝাল-মুড়ি ও চানাচুর বিক্রি, আগরবাতি তৈরির মালামাল, টক দই বিক্রি, ঠোঙা বিক্রি, হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি, শাকসবজি বিক্রির ভ্যানগাড়ি, চায়ের দোকানের উপকরণ দেওয়া হয়েছিল। ওই বছরই যশোর জেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক পেশাদার ভিক্ষুকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দেন।
এসবের কোন প্রভাব বর্তমানে নেই। বরং শহরের মধ্যে কোনো জায়গায় কেনাকাটা করতে গেলেই ভিক্ষুকরা ঘিরে ধরছে। ভিক্ষুক ছাড়া কোনো জায়গা নেই।
কলেজ শিক্ষক নাসির উদ্দিন জানান ভিক্ষুকদের আচরণ এক প্রকার অত্যাচারে পরিণত হয়েছে। অনেকে তাদের ছেলে মেয়েদেরও ভিক্ষাবৃত্তিতে যুক্ত করছেন।
কেউ অভাবে আবার কেউ স্বভাবে ভিক্ষাবৃত্তি করছেন। স্বভাবীদের কথা বাদ দিলে অভাবীর সংখ্যাও কম নয়।