ফ্যাসিবাদের নির্মমতার স্মৃতি রোমন্থনে আবেগআপ্লুত মিলন মেলা বিএনপির

0

স্টাফ রিপোর্টার॥ যশোরে ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের নিয়ে ব্যতিক্রমী মিলনমেলা হয়েছে গতকাল। যশোর নগর ও সদর উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে বাহাদুরপুরের জেস গার্ডেনে এ আয়োজন করা হয়। এতে বিএনপির আড়াই সহস্রাধিক নির্যাতিত নেতা-কর্মী ও তাদের স্বজনরা অংশ নেন। দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের একসঙ্গে পেয়ে আবেগাপ্লুত হন নেতা-কর্মীরা।
সকাল ১১টা থেকে শুরু হওয়া দিনব্যাপী মিলন মেলায় বিকেলে এক স্মৃতিচারণ সভার মাধ্যমে শেষ হয়। এর আগে দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয় আগত সকলকে।
ভয়ংকর সেইসব দিনের কথা স্মৃতিচারণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। তাদের একজন যশোর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-প্রচার সম্পাদক ইউনুচ আলী তারা বাবু। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় সাদা পোশাকধারী পুলিশ। ডিবি অফিসে নিয়ে পায়ে অস্ত্র ঠেঁকিয়ে গুলি করে। ওইদিনই অপারেশন করে তার পা কেটে ফেলতে হয়। মিথ্যা অস্ত্র ও নাশকতার মামলা তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। ক্র্যাচে ভর করেই তাকে চলতে হচ্ছে। জানান, তার নামে পেন্ডিং মামলাসহ ১৬টি মামলা দেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর আজকের মিলনমেলায় আমন্ত্রণ পাওয়ায় খুশি তিনি। তার উপর নির্যাতনের বিচার চাইলেন আল্লাহর কাছে।’
নির্যাতনে মুত্যুবরণকারী নগর যুবদল নেতা সামিউজ্জামান উজ্জ্বলের মেয়ে আনিকা জামান বলেন, আমার পিতা ফ্যাসিস্ট সরকারের মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে ২০১৪ সালে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। ফ্যাসিবাদ মুক্ত আবহে আজ বিএনপি আমাদের নিয়ে যে আয়োজন করেছে এতে স্বপরিবারে অংশ নিতে পেরে আমার খুবই আনন্দিত। পিতার মত্যৃর পরও দল আমাদের কথা মনে রেখেছে এটি কোন ভাবেই ভোলার নয়।
সদরের লেবুতলা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হায়দার আলী বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোট নিয়ে সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলাম পরে পুলিশ স্থানীয় বাজার থেকে তুলে এনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও নাশকতা মামলার আসামি করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। দীর্ঘ দুই বছর তিন মাস কারাভোগের পর বাড়ি ফিরলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে লাগাতার হামলা মামলার জর্জারিত ছিলাম। নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের মিলনমেলার আয়োজন করায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
শুধু ইউনুচ আলী কিংবা হায়দার আলী অথবা আনিকা জামান নয়, তাদের মত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে অত্যাচার নির্যাতন ও মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন যশোর নগর ও সদর উপজেলা বিএনিপর আড়াই হাজার নেতা-কর্মী ও স্বজনদের মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় অংশ নিয়ে খুশি নেতা-কর্মীরা। মিলনমেলা থেকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতাসহ সকলে।
গতকাল সকালে খতমে কোরআনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। পরে বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত হয়। একে অপারের সাথে কুশল বিনিময় শেষে অনুষ্ঠিত হয় মধ্যহ্ন ভোজ। বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত নিজহাতে আমন্ত্রিত অতিথি এবং দলের নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের মাঝে খাবার পরিবেশন করেন।
আয়োজনে আমন্ত্রিত ছিলেন জামায়েত ইসলামী, জাপা, হেফাজতে ইসলাম ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
জামায়েত ইসলামী যশোর জেলা শাখার আমীর অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, নির্যাতিত নিপীড়িত নেতা-কর্মী ও তাদের স্বজনদের এ আয়োজন প্রশংসনীয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ধন্যবাদ জানাই এমন ব্যতিক্রমধর্মী একটি আয়োজন করার জন্য। ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে বিএনপি নেত-কর্মীদের মত আমরাও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছি।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যশোর জেলা শাখার আহ্বায়ক রাশেদ খান বিএনপির এমন ব্যতিক্রম উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত অনেক আগে থেকেই। সেই আন্দোলনে বিএনপি উল্লেখ্যযোগ্য অবদান রয়েছে। এছাড়া আরও অনেক দল আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। আন্দোলন পরবর্তী এই সময়ে সকলের ঐক্য প্রয়োজন।
স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মটর পার্টস ও টায়ার টিউব ব্যবসায়ী সমিতি যশোর সার্কেলের সভাপতি শাহিনুর হোসেন ঠান্ডু বলেন, ২০১৭ সালে যশোর চেম্বার ও অব কমার্সের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাতে আমার বাড়িতে পুলিশ হামলা করে। বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর করে ছোট বাচ্চাদের সামনে থেকে আমাকে আটক করে নিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে থানায় নিয়ে যায়। চেম্বারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও আমরা নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাইনি।
ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) যশোর জেলা শাখার নেতা ফারুক এহতেশাম পরাগ বলেন, নিজ জেলায় আমাদের চাকরি করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি পাশের জেলায় পোস্টিং নিয়েও আমাদের যোগদান করতে দেওয়া হয়নি। অনেকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছিল। আমাদের নেতা ইমদাদুল হক অত্যাচারিত হতে হতে মৃত্যুবরণ করেছেন। ২০০৯ সালে ৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ শপথ গ্রহণের পর ১৭ জানুয়ারি আমাকে অন্যত্র পোস্টিং করা হয়। আজ পর্যন্ত পোস্টিং নিয়ে যশোরের আসতে পারিনি। তারপরও আমি আমার আদর্শ থেকে সরে যাইনি। আমাকে বারংবার বলা হয়েছে একটি সরি বললে আমি যশোরে আসতে পারবো। কিন্তু আমি গর্বিত আল্লাহর রহমতে আমাকে সরি বলতে হয়নি।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালে তাদের দলটির সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত ইছালী ইউনিয়ন বিএনপি নেতা খলিলুর রহমানের পুত্র মোহাম্মদ হাসান বলেন, ওই বছর জানুয়ারি মাসে উপজেলা নির্বাচন ছিল। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার সেই নির্বাচনে প্রার্থী হন। এরপর ২৫ জানুয়ারি আমাদের গ্রামের একটি মিটিং হয়। পরদিন আমার পিতা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নৃশংস খুনের শিকার হন। পিতা হারানোর পরও আমি এক দশক বাড়ি থাকতে পারিনি। একের পর এক মিথ্যা মামলায় কখনো কারাগারে কখনো বা পলাতক থাকতে হয়েছে।
মহিলা দল নেত্রী পাপিয়া রাজ্জাক বলেন, ২০২৩ সালের শেষের দিকে আন্দোলনে শহরের মুড়লী থেকে আমাকেসহ ছয়জন ডিবি পুলিশ আটক করে। আমরা মহিলা হওয়া সত্ত্বেও ডিবি পুলিশ সদস্যরা আমাদের রাস্তার ওপর মারপিট এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। সেই নির্যাতনের বর্ণনা আমাদের স্বামীদের সাথে বলতে পারিনি। পরে মিথ্যা মামলা কারাগারে নিক্ষেপ করে ৩২ দিন কারাভোগের পর অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের প্রচেষ্টায় মুক্তি লাভ করি। তৎকালীন ডিবি পুলিশের কর্মকর্তা সেই অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
স্মৃতিচারণকালে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আজ এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আমার যতটুকু অর্জন ও সাফল্য তার সকল কৃতিত্ব নগর ও সদর উপজেলা সর্বোপরী যশোর জেলা বিএনপি ও গণতন্ত্রকামী মানুষের। এ অনুষ্ঠানের কথা আমাদের অভিভাবক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জানিয়েছি। আমরা আপনাদের সাথে ছিলাম, আপনারাও আমাদের সাথে ছিলেন এটিই হচ্ছে শক্তির জায়গা। যে চিন্তা ভাবনা কিংবা নির্দেশনা আমরা দলের পক্ষ থেকে দিয়েছি বরাবরই আপনারা সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, আমরা দলের পক্ষ থেকে বারংবার বলেছি ফ্যাসিস্টের পতন কোন একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দল এবং সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ গণঅভুত্থানেই ফ্যাসিস্টের পতন হয়েছে। এটি উপলদ্ধি করে সকলেই যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছি তখনই পরিবর্তনটি সূচিত হয়েছে। সে কারণে আজকে এই আয়োজনেও আমরা সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দলের নির্যাতিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা আমাদের শক্তির জায়গা। আমরা এখনো কাঙ্খিত বাংলাদেশ পাইনি। সেই বাংলাদেশ পাবার ক্ষেত্রে অর্ধ্যকে পথ পাড়ি দিয়েছি এখনো দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে। সেই পথ পাড়ি দিতে হলে আমাদেরকে একতা এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, এই আয়োজনের মাধ্যমে আপনাদের সেই বার্তাটুকু দিতে চেয়েছি। আপনাদের মত আমার হৃদয়েও শহীদ জিয়ার আদর্শ গ্রথিত। নিশ্চিত থাকতে পারেন রাজপথের আন্দোলনে অতীতে যেমন আপনাদের ছেড়ে যায়নি। বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ছাঁয়ার মত আপনাদের অনুসারণ করবো ইনশাআল্লাহ।
এসময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সিনিয়র সাংবাদিক হারুন জামিল, নূর ইসলাম, নগর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌধুরী মুল্লুক চাঁদ, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আঞ্জুরুল হক খোকন, মহিলা দল নেত্রী আনোয়ারা পারভিন আনু। স্মৃতিচারণ পর্ব পরিচালনা করেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা আমির ফয়সাল।