চালের বাজারের অস্থিরতা নতুন বছরেও

0

শেখ আব্দুল্লাহ হুসাইন ॥ চালের বাজারে অস্থিরতা নিয়ে পার হল ২০২৪ সাল। নতুন বছরে এল বাজারের কোন সুখবর ছাড়াই। আমন ধান আবাদে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ফলন কম এবং ডলারের মূল্য বেশিকে দায়ি করছেন ব্যবসায়ীরা।
শুল্কমুক্ত চাল আমদানি সুবিধার পরও বাজারে চালের দাম কমছে না। কিছু বড় ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা ধান-চাল মজুত ও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। নতুন আমন ধানের চাল বাজারে ওঠার পরও গত দু মাসে প্রতি কেজি চালে প্রকারভেদে ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে। কৃষি বিভাগের অভিমত প্রাকৃতিক দুর্যোগে যশোর জেলায় আমন আবাদে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। ভোক্তাদের অভিযোগ বাজারে মজুতদারদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। ফলে তারা সুযোগ নিয়ে বাজারে চালের দাম বাড়াচ্ছে।
চলতি বছর পর্যায়ক্রমে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাত দেশে ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে দেশে চালের ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যবসায়ীদের চাল শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেয়। এরপরও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে বাজারে চালের দাম কমার পরিবর্তে আরও বাড়ছে। তাছাড়া যশোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী যশোর জেলায় এবার আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১৬ হেক্টর জমিতে আবাদ কম হলেও বড় রকমের ঘাটতি নেই। কৃষি বিভাগের আমন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ১৬৭ মেট্রিক টন, সেখানে উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৮৮৮ মেট্রিক টন। আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৪১১ হেক্টর জমিতে, সেখানে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে।
বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে আমদানিকারকরা ডলার সংকট ও মিল মালিকরা হাটে ধানের দাম বেশিকে দায়ী করছেন। তবে সাধারণ ব্যবসায়ীরা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বড় ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের দায়ী করছেন। যশোরের চাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ মাহাবুবুল আলম প্রোডাক্ট’ এর স্বত্বাধিকারী মো. মাহাবুবুল আলম লোকসমাজকে বলেন, শুল্কমুক্ত চাল আমদানি হলেও ব্যাংকে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে তারা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) করতে পারছেন না। তাছাড়া এরই মধ্যে প্রচুর চাল ভারত থেকে আমদানি হয়ে দেশে এসেছে। কিন্তু চালের দাম বেশি। আমদানি করা মোটা চাল সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কেজি দাম পড়ছে ৫৪ টাকা। যশোরের মনিরামপুরে ‘ব্যাপারি অটো রাইস মিল’ এর জেনারেল ম্যানেজার মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাটে ধান খুব কম, মোটা স্বর্ণা ধান ভালোমানের প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১৪শ টাকা। তিনি আরও বলেন, তাদের বিভিন্ন মিল মালিকরা বসে চালের দাম নির্ধারণ করেন।
যশোর চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সুশীল কুমার বিশ্বাস সোমবার জানান, এদিন শহরের বড় বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি বাংলামতি চাল মানভেদে ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা, মিনিকেট চাল ৬৮ থেকে ৭২ টাকা, বিআর-৬৩ চাল ৭০ থেকে ৭২ টাকা, সুবললতা চাল ৬৮ টাকা, বিআর-৪৯ চাল ৫৬ থেকে ৫৮ টাকা, স্বর্ণা চাল ৫২ থেকে ৫৩ টাকা ও হীরা চাল ৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তিনি আরও বলেন নতুন আমন ধানের চাল ওঠার পরও গত দু মাসে প্রতি চালের কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এদিকে যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো.মোশাররফ হোসেন লোকসমাজকে জানান, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যশোর জেলায় আমরা আমন ধানের টার্গেট পূরণ করতে না পারলেও বড় ধরনের ঘাটতি নেই। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে আমরা বোরো ধানের টার্গেট অর্জন করতে পারবো। তবে আমনে যতটুকু ক্ষতি হয়েছে তাতে প্রভাব পড়বে না।’
তবে যশোর শহরের বড় বাজারে চাল কিনতে আসা সিরাজুল ইসলাম জানান, সরকার আমদানিকারদের শুল্কমুক্ত চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া ও আমনের ভরা মৌসুমেও শুধুমাত্র বিগত সরকারের আমলের সিন্ডিকেটদের কারণে বাজারে দাম কমার পরিবর্তে বাড়ছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে তদারকি সংস্থাগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে না।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর যশোরের সহকারী পরিচালক সৈয়দা তামান্না তাসনীম লোকসমাজকে জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণে তারা কঠোর হবেন, কোনো সিন্ডিকেট বা বড় ব্যবসায়ীরা বাজারে চালের দামে হস্তক্ষেপ করলে ব্যবস্থা নেবেন।