মহান বিজয় দিবস আজ

0

মাসুদ রানা বাবু ॥ আজ মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির হাজার বছরের বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখ-ের নাম জানান দেওয়ার দিন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য বিজয়। সমস্বরে একটি ধ্বনি যেন নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেয়, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল।’ মহামুক্তির আনন্দ ঘোর এই দিনে এক নতুন উল্লাস জাতিকে প্রাণ সঞ্চার করে সজীবতা এনে দেয়। অর্জিত হয় হাজার বছরের কাঙ্খিত স্বাধীনতা।
হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তে অর্জিত ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশে এবারের বিজয় দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে নতুন আবহে। যুগে যুগে সংগ্রাম আত্মবলিদানের মাধ্যমে বাংলাদেশিরা প্রমাণ করেছে শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে জয় সুনিশ্চিত। ফ্যাসিস্ট সরকার নির্বাসনে গেলেও তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে বাংলাদেশি জনতা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানেও বিজয়ী হবে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন সংগ্রামী ছাত্র-জনতা। যেমন ৭১ এর গৌরবদীপ্ত বিজয়ের সাথে আরও একটি বিজয় এসেছে ৫ আগস্ট। ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় বিজয়।
৭১ এর ২৫ মার্চ রাতেই ‘উই রিভোল্ট’ বলে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রতিরোধের সুচনা করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি মেজর জিয়াউর রহমান। এরপর ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। ৯ মাসের সশস্ত্র জনযুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর জাতির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
১৯৪৮ সাল থেকে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। সেই হিসাবে বিজয়ের ৫৩ বছর পূর্তির দিন আজ।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি,প্রধান উপদেষ্টা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।
মহান বিজয় দিবস-২০২৪ যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মো. ইউনুস সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।
মহান জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে এদিন সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে। দিবসটি উপলক্ষে সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হবে। এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য সংবর্ধনা প্রদান করা হবে ।
১৯৭১ সালের এই দিন আত্মসমর্পণের আগে-পরে পাক হানাদার বাহিনীর প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। তারা শঙ্কিত ছিল,নয় মাসের গণহত্যা,নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংসযোগ ও লুটতরাজের কারণে ক্ষুদ্ধ মুক্তিবাহিনী আর জনতা তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে। এদিন দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের হেডকোয়ার্টারে মিত্রবাহিনীর মেজর জেনারেল জ্যাকব আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ নিয়াজির মধ্যে আত্মসমর্পণ চুক্তি নিয়ে যখন দর কষাকষি চলছে, তখন পাকিস্তানি বাহিনীর নিরাপত্তা ছিল আলোচনার একটি বড় বিষয়। ঢাকায় তখন পাকিস্তানি সৈন্য আর নানা রকম আধাসামরিক বাহিনীর লোকজন মিলিয়ে ৯৪ হাজর সদস্য আটকে পড়ে। লে. জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ নিয়াজি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ না করে সেনানিবাসে তার সদর দপ্তরেই আত্মসমর্পণের ব্যাপারে চাপাচাপি করছিলেন। সেটা যে কেবল জনসমক্ষে এড়ানোর জন্য নয়, এর পেছনে তাদের নিজেদের পিঠ বাঁচানোর চিন্তার বিষয়টি কাজ করছিল। লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর নিয়াজিকে বহনকারী গাড়ি বহর লাখ লাখ জনতার ভিড় ঠেলে রেসকোর্স ময়দানের দিকে এগোচ্ছিল, তখন একাধিকবার তাদের গাড়ি বহর রুদ্ধ হয়ে যায় জনতার চাপে। ক্ষিপ্ত জনতা নিয়াজিকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। তারা বলছিল, ‘নিয়াজিকে আমাদের হাতে দাও। ও খুনি। ও আমাদের লাখ লাখ লোক মেরেছে, আমরা ওর বিচার করবো’
এর আগে দুপুর ১টার দিকে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের হেডকোয়ার্টারে আত্মসমর্পণের দলিল তৈরির বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ। যৌথবাহিনীর পক্ষে ছিলেন মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব, মেজর জেনারেল গন্ধর্ভ সিং নাগরা ও কাদেরিয়া বাহিনীর কমান্ডার কাদের সিদ্দিকী। সিদ্ধান্ত হয়, আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করবেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার ও যৌথবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী। বৈঠকে ঠিক হয়, আত্মসমর্পণ করলেও তখনই অস্ত্র সমর্পণ করবে না পাকিস্তানি বাহিনী। তখন মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব বলেন, ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে অবশ্যই অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় যুদ্ধবন্দী থাকবে ঠিক, কিন্তু ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে তারা থাকবে সশস্ত্র।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী সমগ্র বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে মারাত্মক মারণাস্ত্র নিয়ে ঘুমন্ত জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালি নিধনযজ্ঞ। পাক হানাদার বাহিনীর দীর্ঘ ৯ মাসের নারকীয় তান্ডবে বাংলার বাতাসের ছিল লাশের গন্ধ, আর আকাশ ছিল বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। অবশেষে ৯ মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে এলো নতুন প্রভাত। ১৬ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হলো মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য বিজয়। সমস্বরে একটি ধ্বনি যেন নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেয়, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল।’ মহামুক্তির আনন্দ ঘোর এই দিনে এক নতুন উল্লাস জাতিকে প্রাণ সঞ্চার করে সজীবতা এনে দেয়। অর্জিত হয় হাজার বছরের কাঙ্খিত স্বাধীনতা।