স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কখনও পজেটিভ কোন ঘটনায় বা আলোচনায় যার না উচ্চারণ হয়নি তিনি হচ্ছেন শাহীন চাকালাদার। নিজের মহল্লা পুরাতন কসবা থেকে শুরু হয় তার সন্ত্রাস। এ মহল্লায় এক সময় চাকলাদার বাহিনী ও ঢোল রফিক বাহিনীর বোমাবাজি ও গোলাগুলিতে আতংকে থাকতেন স্থানীয়রা। এরপর যখন শাহীন চাকলাদার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হলেন সেই সন্ত্রাস সংক্রমিত হয় দলে। দলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সন্ত্রাস ও অসৌজন্যমূলক ব্যবহার কোনটাই বাদ দেননি তিনি।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ক্রমেই কোনঠাসা হয়ে পড়েন শাহীন চাকলাদারের অতিমাত্রায় দুর্ব্যবহারের কারণে। জ্যেষ্ঠ ওই নেতারা ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন দলীয় কর্মকান্ডেও। সন্ত্রাস নির্ভর দলে পরিণত হয় যশোর জেলা আওয়ামী লীগ। যেখানেই শাহীন চাকলাদারের পা পড়েছে সেখানেই সংক্রমিত হয়েছে সন্ত্রাস। আধিপত্য তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসী ও মাদকাসক্তদের। ক্রমশ তা ছড়িয়েছে ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভায়।
এমনকি তিনি যখন কেশবপুর উপজেলায় গিয়ে সংসদ সদস্য হলেন যশোর শহরের সন্ত্রাস সংক্রমিত হল সেখানেও। অবশ্য তার এ সন্ত্রাসের জবাব দিয়েছে কেশবপুরের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গত সংসদ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে অন্য কোন দল অংশ না নেওয়ায় প্রার্থী যেমন ছিলেন আওয়ামী লীগের ভোট দিতেও এসেছিলেন একই দলের ভোটাররা। সেখানে নৌকা প্রতীক পেয়েও স্বতন্ত্রপ্রার্থী দলীয় এক যুবকের কাছে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয় শাহীন চাকলাদারকে।
এছাড়া টাকার জন্য হেন কোন কাজ নেই যা তিনি করেননি। যশোরে মদের বার ও ডিজে পার্টির আসর বসিয়ে শহরের ছড়িয়েছেন বিশৃঙ্খলা।
আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে যশোরের মোড়ে মোড়ে ছিল এক একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। দখলদারি, চাঁদাবাজি, খুন খারাবি এসব বাহিনীর ছিল নিত্য দিনের কারবার। চাঁদাবাজির সর্বনিম্ন দর ছিল ১০ টাকা, নেয়া হতো ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে। সর্বোচ্চ চাঁদার কোন সীমা পরিসীমা ছিল না। জমি বেচতে চাঁদা, কিনতে চাঁদা, বাড়ি তৈরিতে চাঁদা, ইট খোয়া বালি বিক্রির নামেও চাঁদা।
এসব চাঁদাবাজদের কবল থেকে বাদ পড়েননি সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা, এমনকি পুলিশ সদস্যরাও। জমি, বাড়ি, ব্যবস্যা প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয়ার অসংখ্য প্রমাণ আছে এসব বাহিনীর বাহিনীর বিরুদ্ধে। এসব চাঁদাবাজি হতো শাহীন চাকলাদারের নামে। চাকালাদার নামেই চলতো যত অপকর্ম। চাঁদাবাজি তো নস্যি, খুনের মত ঘটনা ঘটিয়েও বাহিনীর সদস্যরা আশ্রয় প্রশ্রয় পেতেন শাহিন চাকলাদারের কাছে। বাহিনী পুষে শাহিন চাকলাদার হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। বাহিনী প্রধানদের কারে কারো সম্পদ কোটি ছড়িয়ে গেছে।
সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দাতা শাহীন চাকলাদারকে ৫ আগস্টের ছাত্র গণঅভ্যূত্থানের পর থেকে আর দেখা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে তার সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
শাহীন চাকলাদার ২০০৪ সাল থেকে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি ২০০৯ সাল থেকে ২০২০সাল পর্যন্ত যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর ২১ জানুয়ারি ২০২০ সালে সংসদ সদস্য ও সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুর পর যশোর-৬ শূন্য আসনটির ১৪ জুলাই ২০২০ তারিখের উপনির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও নিজ দলীয় বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন তিনি ।
তবে এই দীর্ঘ সময়ে শাহীন চাকলাদার যশোর আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন। রাজনীতিতে অভিষেক হওয়ার আগে শাহীন চাকলাদার মূলত ঠিকাদার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে শাহীন চাকলাদারের অনুসারীদের দাবি, চাকলাদার পরিবহন শাহীন চাকলাদারের পারিবারিক ব্যবসা। দেশ স্বাধীনের পর থেকে তারা এ ব্যবসা করে আসছেন। মূলত পরিবহন ব্যবসা দিয়েই চাকলাদার পরিবার যশোরে পরিচিতি লাভ করে। তার পিতা মরহুম আবদুল মান্নান চাকলাদার ছিলেন তহশিলদার। তিনি ১৯৮৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
পরবর্তী সময়ে পরিবহন ব্যবসায়ের পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি ব্যবসায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। এর পাশাপাশি শহরের এমএম আলী রোডে জামান ফার্মেসী নামে একটি ওষুধের দোকানও পরিচালনা করতেন তিনি। এ সময়ে তাদের জীবন-যাপন সাদাসিধে থাকলেও আওয়ামী রাজনীতি প্রবেশ করে একেবারেই বদলে যায়। পতিত সরকারের গত ১৬ বছরে শাহীন চাকলাদারের সম্পদ বেড়ে আকাশ স্পর্শ করেছে। এসময়ে তিনি শত শত কোটি টাকা সম্পদের মালিক বনে যায় বলে একাধিক সূত্র দাবি করছে।
প্রাপ্ত অভিযোগে জানা যায়, ২০০৩ সালে জেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটিতে স্থান পেয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন শাহীন চাকলাদার। এরপর এক বছর পরই শাহীন চাকলাদার যশোর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে দলে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরীয়া হয়ে ওঠেন। শহর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে তোলেন ছোট ছোট সন্ত্রাসী বাহিনী।
এসব দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো শাহীন চাকলাদারের হয়ে পরিচালনা করতো তারই চাচাতো ভাই সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সদর উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহারুল ইসলাম, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন বিপুল, যশোর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন সুমন, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রওশন আলী শাহীসহ আরও কয়েকজন। এসব সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ঘের দখল, জুয়ার আসর দখলসহ নানা অপকর্ম করে কোটি কোটি টাকা আয় করতে থাকেন শাহীন চাকলাদার।
সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য শাহীন চাকলাদার নিজ দলেও সমালোচিত ছিলেন। যে কারণে কয়েক দফা দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ-গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। দলের অভ্যন্তরে এমন শক্তি বলয় তৈরি করেন যে তার এসব অপকর্মের প্রতিবাদ পর্যন্ত কেউ করতে সাহস পায়নি তখন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শাহীন চাকলাদারের কাছে নিজ দলের নেতা-কর্মীরাও নিরাপদ ছিলেন না। দলের পরীক্ষিত-ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করতেন না। বরং অসংখ্য নেতা-কর্মী তার ও তার বাহিনীর লোকজনের কাছে অপমান-অপদস্ত হয়েছে। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা খালেদুর রহমান টিটো, আলী রেজা রাজু, অ্যাডভোকেট শরীফ আব্দুর রাকিবের মত্যে বর্ষীয়াণ নেতারাও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর আক্রোশের শিকার হয়েছেন। পতিত সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের সাথে তার ছিল সাপে নেউলে সম্পর্ক।
জানা যায়, ২০১৪ সালে শাহীন চাকলাদার যখন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন তখন তার মনোনয়নের সাথে যে হলফনামা জমা দেয় সেখানে তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ছিলো মোট ১৪ কোটি টাকা। সেটি মাত্র ৫ বছরে ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ কোটি টাকা। অল্প সময়ে এ টাকা বৃদ্ধির বিষয়টি সে সময়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসলেও ক্ষমতার প্রভাবের কারণে সেটি পদক্ষেপ নেয়ার মতো কোনো উদ্যোগই নিতে পারেনি ওই সংস্থাটি।
এরপর থেকে বলা চলে শাহীন চাকলাদার শুধু যশোর শহর নয়, গোটা জেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। নিজ দলের অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মীরাও অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে শাহীন চাকলাদারের প্রভাব বলয়ের কাছে। এসময়ে তার আশ্রিত সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন বেশ কয়েকজন নিজ দল ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মী। সাথে বিরোধী মতের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর নেমে আসে নানা নিপীড়ন।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায় শাহীন চাকলাদারের বিপুল অর্থের ভান্ডার বড় হতে থাকে মূলত টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি থেকে। তার বিরুদ্ধে সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানির অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরেও জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময় বিভিন্ন উপজেলার নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের কাছ থেকেও টাকা নিয়ে পদ দেয়ার মতো গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে তার নিয়ন্ত্রিত যশোর হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে একটি ক্যাসিনো বার ছিলো। এখানে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীরা নিয়মিত জুয়া ও মদ পান করতো। এটিই ছিলো শাহীন চাকলাদারের অর্থ উপার্জনের বড় উৎস। ওই হোটেলে বিভিন্ন বিচার শালিস ও বড় বড় মামলা মীমাংসা করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করতেন।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের শাসনামলে শাহীন চাকলাদার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। যশোর শহরের চিত্রা সিনেমা হলটিকে সিনেমা স্টাইলে দখল করে নিয়ে সেখানে গড়ে তোলেন ৫ তারকার হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল। যা গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় অগ্নিকান্ডে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকা, কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে শত শত বিঘা জমি রয়েছে শাহীন চাকলাদারের নামে-বেনামে। এর বাইরে রাজধানীর কলাবাগান, উত্তরাসহ একাধিক স্থানে শাহীন চাকলাদারের নামে জমি ও ফ্লাট আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রেও শাহীন চাকলাদারের নামে-বেনামে জমি ও বাড়ি আছে বলে জানা গেছে। কেশবপুর আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হওয়ার সেখানে এমন কোনো অপরাধ নেই তিনি করেন। এক মানবাধিকার কর্মীকে ফাসাতে ইটের ভাটায় বোমা মারতে ওসিকে নির্দেশ দেয়ার একটি অডিও ভাইরাল নিয়ে আলোচনায় আসেন শাহীন চাকলাদার। বাধ্য হয়ে সাইফুল্লাহ নামে মানবাধিকার কর্মী প্রাণনাশের আশঙ্কায় আদালতে মামলা করতে বাধ্য হন।
এদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ইতোমধ্যে শাহীন চাকলাদারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দদমন কমিশন (দুদক)। গত ২২ সেপ্টেম্বর দুদকের কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শাহীন চাকলাদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়ায় অনুসন্থানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শাহীন চাকলাদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিজ ও আত্মীয়-স্বজনের নামে দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ উঠেছে। তার অবৈধভাবে অর্জিত জ্ঞাত-আয় বর্হিভুত সম্পদ রয়েছে মর্মে দুদেকর গোয়েন্দা তথ্যানুসন্ধানে প্রাথমিক সঠিক পরিলক্ষিত হওয়ায় অভিযোগটি প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের জন্য কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।





