বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ নতুন বাস্তবতায় শিক্ষাগুরুর মর্যাদা

0

স্টাফ রিপোর্টার ।। ছাত্রদের গণ-অভ্যুত্থানে নতুন বাংলাদেশের পথ সুগম হয়েছে। এখন গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে ছাত্ররা বিভিন্ন শিক্ষকের পদত্যাগ চাইছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষককে তারা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় প্রভাব অনুভ‚ত হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে। এ বাস্তবতায় আজ ৫ অক্টোবর পালিত হবে বিশ^ শিক্ষক দিবস।

যারা এত দিন সাবেক সরকারের সঙ্গে সখ্যের বিনিময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে বসে অন্যায় করেছেন, তারা যেমন গর্হিত কাজ করেছেন; তেমনি এখন যারা ছাত্রদের ব্যবহার করে সেই শিক্ষকদের জনসমক্ষে হেনস্তা করছেন, তারাও গর্হিত কাজ করছেন।

শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের আচরণে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে বিস্মিত, ক্ষুব্ধ, হতাশ হচ্ছেন। সব দোষ গিয়ে পড়ছে ছাত্রদের ওপর। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, ‘জেন-জি নষ্ট প্রজন্ম, এদের পড়াশোনার কী মূল্য, যারা শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে।’

শিক্ষকতার সাথে জড়িত অনেকের অভিমত, ‘যেদিন থেকে শিক্ষকরা রাষ্ট্রের কাছে নিজের মর্যাদা দাবি করেছে, সেদিন থেকে তারা সমাজের কাছে মর্যাদা হারাতে শুরু করেছে। ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলায় শিক্ষক বা গুরুরা ছিলেন সমাজের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে। বাংলাদেশে এখন সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা তলানিতে।’

শিক্ষকের মর্যাদার প্রসঙ্গ আসলেই কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতা সামনে আসে। বাদশা আলমগীর একদিন দেখেন, তার পুত্র শিক্ষকের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর শিক্ষক নিজের পা পরিষ্কার করছেন। শিক্ষক ভাবেন, এবার বুঝি তার প্রাণ যাবে রাজপুত্রকে দিয়ে পায়ে পানি ঢালানোর কারণে।

শিক্ষক কিছুক্ষণ ভেবে নিজের আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়ে মনে মনে বললেন,

‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার

দিল¬ীর পতি সে তো কোন্ ছার,

ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল,

বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।

যায় যাবে প্রাণ তাহে,

প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।’

পরে বাদশাহ স্বয়ং শিক্ষককে ডেকে বলছেন, আমি দেখলাম আমার পুত্র কেবল আপনার পায়ে পানি ঢালছে, আর আপনি নিজে হাতে পা পরিষ্কার করছেন। আমার পুত্র কেন আপনার পায়ের ধুলি পরিষ্কার করলো না?

এই কবিতার মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল সমাজে একজন শিক্ষকের মর্যাদা ঠিক কতটা উপরে। পাশাপাশি শিক্ষাগুরুর আত্মমর্যাদা বোধ কতটা হওয়া দরকার সেটাও শিক্ষকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

শিক্ষকরা যেদিন থেকে নিজেদেরকে সাধারণ চাকরিজীবী বা সরকারি কর্মচারী হিসেবে মনে করতে শুরু করেছেন, সেদিন থেকে রাষ্ট্রও তাদেরকে সেভাবেই ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

স্বল্প বেতনে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কিসে ভালো হবে তা না ভেবে, বরং নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধাদি পাওয়ার দিকে মনযোগ দিয়েছেন বেশি।

স্কুলে শেখানোর চেয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে শেখানোতে বেশি উৎসাহী হওয়ার জন্য এবং ক্ষেত্র বিশেষে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য করায় সমাজে এখন শিক্ষকদের মর্যাদা তলানিতে। আর এভাবেই গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা কমে এসেছে।

আফসোসের কথা হচ্ছে সরকারের উচ্চমহল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন, মাল্টিমিডিয়া, কম্পিউটার ল্যাব করার জন্য যতটা উৎসাহী, তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না শিক্ষকদের মূল সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে। যেহেতু সেই সমস্যা সমাধান করায় কোনো তৎপরতা নেই, তাই আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থারও কোনো উন্নতি নেই।

এটা নিশ্চিত যে আমাদের দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষকতায় তরুণ মেধাবীদের না আনতে পারলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। অন্যদিকে বর্তমানে যেসব মেধাবী ও উদ্যমী শিক্ষকরা আছেন, তাদের বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ না দিলে তারাও উদ্যমহীন হয়ে পড়বেন। একজন মেধাবী ও উদ্যমী মানুষ নিজের কাজের পরিধি বাড়াতে চান, সমাজ পরিবর্তনে ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখতে চান। বর্তমান বাস্তবতায় মেধাবীদের এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই।