যশোরে স্বেচ্ছাসেবক দলের বিশাল গণসমাবেশ কৃত্রিম অরাজকতা তৈরি করে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করা হচ্ছে : রিজভী

0

মাসুদ রানা বাবু ॥ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাড. রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সবচেয়ে বড় হীরার নাম হচ্ছে কোহিনুর, আর ভারতের সবচেয়ে বড় হীরার নাম হচ্ছে শেখ হাসিনা। এত বড় একটা হীরা হারিয়ে, তাদের মনোবেদনা ও কষ্ট যেন থামছেই না। তাই গণহত্যাকারী পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও ভারত শেখ হাসিনার মদদে দেশে পরিকল্পিতভাবে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। হাসিনার পতন এবং উৎখাতে যারা কাজ করেছেন তার ( শেখ হাসিনা) প্রভূ ভারত তাদের সহ্য করতে পারছে না। ভারত সরাসরি নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশÑভারত সীমান্ত রক্তাক্ত করতে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কী হচ্ছে সেটি দেশের জনগণ জানে। খুলনার দাকোপে সংখ্যালঘুসম্প্রদায় কিংবা দুর্গাপূজা লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন চালানোর পাঁয়তারা কারা করছে এটি জানার বাইরে নয়। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের মানুষ শান্তিতে স্বস্তিতে রয়েছে এটা ভারত সহ্য করতে পারছে না। একটা কৃত্রিম অরাজকতা তৈরি করে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করা হচ্ছে।

রোববার যশোর শহরের চৌরাস্তা মোড়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত বিশাল গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পদচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের দাবিতে এবং গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হামলায় কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানীকে আহত এবং দলের ক্রীড়া সম্পাদক শওকত আলী দিদারকে নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে যশোর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল এই গণসমাবেশের আয়োজন করে।
বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের উলটো করে ঝুলিয়ে রাখা হবে, ভারতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র এমন মন্তব্যে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, আপনি কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কত বড় সাহস! অমিত শাহ আপনার জানা উচিত বাংলাদেশ ছোট দেশ না, আমরা ১৮ কোটি জনগণের দেশ।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা ১৬ বছর অনেক নির্যাতন সহ্য করেছি। আমাদেরকে আয়না ঘরে দিনের পর দিন থাকতে হয়েছে। ডিবি কার্যালয়ের গারদ ঘরে কোন প্রকার খাওয়া দাওয়া ছাড়াই নির্যাতন নিপীড়নের মধ্য দিতে থাকতে হয়েছে। বিচার বিভাগ ছিল শেখ হাসিনার জল¬াদখানা। নিজের মনোনীত লোকদের বিচারপতি করে বিএনপির একের পর এক শীর্ষ নেতাদের তারা সাজা দিয়েছে। তারপরও আমরা শেখ হাসিনার সাথে আপস করিনি। এই দেশের পরিত্যক্ত, জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। যিনি জনগণের রক্ত পান করতে ভালো বাসতেন । সর্বশেষ তিনি স্কুলের শিশু বাচ্চা কিশোর তরুণদের রক্ত পান করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তিনি কিছু মানুষকে আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার সুযোগ দিয়ে গোটা জাতিকে অন্ধকারের নিমজ্জিত করে গেছেন। ৩০ লাখ শহিদের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ। এই দেশ কীভাবে চালাবে। আমাদের গণতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করবো সে অধিকার আমাদের ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে ওর (শেখ হাসিনা) বাপের নামে, ভাইয়ের নামে, মায়ের নামে একের পর এক মূর্তি তৈরি করেছেন।

তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তার ল্যান্সপ্যান্সাররা এখনো দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত করছে। তার দলের অনুসারী কালো টাকা কামানো লোক বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ কায়েমের চেষ্টা করছেন। বিচারালয়, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত ভারতের সমর্থক। ৫ আগস্টের পরে আমরা শান্তিতে আছি। বিশুদ্ধ বাতাস নিতে পারছি, বাড়িতে নিরাপদে ঘুমানোর সুযোগ পাচ্ছি। রাতে গোয়েন্দা পুলিশ এসে দরজায় নক করে না, ধরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়েছি। এইটা ওই পার্শ্ববর্তী (ভারত) সহ্য করতে পারছে না।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, শেখ হাসিনা ১৬ বছরের শাসন আমলে বিদেশ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে ১৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। তাহলে কয় টাকা উন্নয়নের জন্য শেখ হাসিনা ব্যয় করেছেন। এই টাকাগুলো আওয়ামী লীগের কোন নেতা, শেখ পরিবারের কোন সদস্য কিংবা ঘনিষ্ঠ লোক, সালমান এফ রহমানের সুপারিশকৃত কোন ব্যক্তি নিয়ে গেছেন। যে টাকা পাচার হয়েছে তার থেকেও এখনো তো কিছু টাকা আছে। এই টাকা তারা ব্যবহার করবে গণতন্ত্রমনা নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।

প্রধান অতিথি বলেন, বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে একটা অত্যান্ত অনুভূতিশীল স্থান ছিল যশোর জেলা। একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে যুবলীগ-ছাত্রলীগের আক্রমণ। এখানে যিনি এমপি ছিলেন তিনি খুব একটা ভদ্র লোক ছিলেন বলে জনগণ মনে করে না। গোপালগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানীর মত একজন জাতীয় পর্যায়ের নেতাকে কীভাবে আঘাত করা হলো। শওকত আলী দিদার নামে একজন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে কি নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। অনেকে মনে করেছিলেন আওয়ামী লীগ আর নেই। তারা পালিয়ে গেছে। কিন্ত আপনাদেরকে বলি, অনেকে পালিয়ে গেছে, আবার অনেকে ঘাপটি মেরে আছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা এখনো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বরদের রেখেছেন কেন? এরাই তো সবচেয়ে বড় আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর। এই যশোরের এমপির মত একেকটি এলাকার দুর্বৃত্ত এমপিরা তাদের নিজেদের সান্ডাপান্ডা দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বার বানিয়েছেন। সুতরাং অবিলম্বে এদেরকে প্রত্যাহার করতে হবে।

গণসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, হাসিনা সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার হলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী । তিনি ডিসি নিয়োগের একটি শর্ত আরোপ করলেন- এডিসি জেনারেল পদে কমপক্ষে ১ বছর দায়িত্ব পালন করলে তাকে ডিসি পদের জন্য নিয়োগ করা হবে। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে ছাত্রলীগ যুবলীগের গুন্ডা ব্যতীত কেউ কি চাকরি পেয়েছে? শেখ হাসিনার সাজানো প্রশাসনের দ্বিতীয় স্তর আজ দায়িত্ব পালন করছে। এই আলী ইমাম মজুমদার শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া প্রশাসনের দায়িত্বে বাংলাদেশকে আগামী এক বছরের জন্য ছেড়ে দিতে চাইলেন। তাই এই গণতন্ত্রকামী মানুষের মাধ্যমে আমি প্রধান উপদেষ্টা বরাবর জানতে চাই, আলী ইমাম মজুমদার আপনার ব্যক্তিগত সহকারীর দায়িত্ব পালন করছেন, নাকি পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার প্রেতাত্মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রধান বক্তার বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান বলেন, কখনো ক্ষমতার চেয়ারে যাওয়ার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করিনি। গত ১৭ বছর ধরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান এই দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করেছেন। ৩৬শে জুলাই ছাত্র জনতার গণ আন্দোলনে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের বাক স্বাধীনতা বা মুক্ত মনে কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু এখনো মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শেষ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে এ দেশের মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর যতদিন এই ভোটাধিকারের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি না হচ্ছে ততোদিন বিএনপি দেশের রাজপথে থাকবে। জনগণকে তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন করে তুলবে। তিনি বিএনপি নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে রাজপথে থাকার পরামর্শ দেন। একই সাথে গোপালগঞ্জে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত দিদার হত্যার সাথে জড়িতদের অবিলম্বে আটক ও বিচারের দাবি জানান।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রবিউল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা আমির ফয়সালের পরিচালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি সর্দার নুরুজ্জামান, যুগ্ম-সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি, যশোর জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আনসারুল হক রানা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহসভাপতি নির্মল কুমার বিট, সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হায়দার রানা, যুগ্ম-সম্পাদক রেজোয়ানুল ইসলাম খান রিয়েল, নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তফা তরফদার রয়েল, সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।