যশোরে সংখ্যালঘু উৎপীড়ক আওয়ামী লীগ

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু (সনাতন ধর্মাবলম্বী) নির্যাতন আওয়ামী লীগের অনেক পুরোনো কৌশল। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুরোনো কৌশলকে নতুন করে সামনে আনার চেষ্টা চলে। তবে যশোরে এ কৌশল কাজে দেয়নি। বিএনপি কর্মীদের অতন্ত্র পাহারায় যশোরের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আছেন নিরাপদ। বরং যশোরের ব্যবসা বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা অবদান রেখে চলেছেন। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ঘায়ের মত দগদগ করছে ২০১৪ সালের যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়া ও ২০১৬ সালের চৌগাছার রানীয়ালীর সংখ্যালঘু নির্যাতন চিত্র।

২০২২ সালের গণশুমারী অনুযায়ী দেশে মোট জনসংখ্যার ৭.৯৫ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের। যশোরের ক্ষেত্রে এ হার ১২ শতাংশ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী যশোরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ৩ লাখ ১০ হাজার ১৮৪ জন। ২০২২ সালের গণশুমারীতে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৮২ জন। এ পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমেয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে যশোর শান্তি প্রিয় একটি স্থান। তাছাড়া যশোরের মুদি ব্যবসার একছত্র নিয়ন্ত্রণ হিন্দু সম্প্রদায়ের। জুয়েলারি, স্টেশনারি, পোশাক, গাড়ি, মাছসহ বেশিরভাগ ব্যবসার শীর্ষ অবস্থানে আছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এসব ক্ষেত্রে তারা অবদান রেখে চলেছেন। পতিত সরকারের আমলে যশোরে মন্ত্রী ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিলেন, আছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই। এরপরেও আওয়ামী লীগ আমলেই হিন্দু নির্যাতনের একাধিক ঘটনা নাড়া দেয় তাদেরকে।

স্মরণকালে যশোরের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটের রাতে অভয়নগর উপজেলার চাপাতলা মলোপাড়ায়। দুর্বৃত্তরা অর্ধশতাধিক বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় লেপ-তোশক থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরের সব জিনিসপত্র পুড়িয়ে ফেলে। হামলার শিকার হয় কয়েক শ নারী-পুরুষ। হামলাকারীদের তা-বে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পাশের ভৈরব নদ পেরিয়ে কয়েক শ নারী-পুরুষ ও শিশু ওই রাতেই আশ্রয় নেয় পাশের দেয়াপাড়া গ্রামে। তিন দফার এই হামলায় গোটা মালোপাড়া গ্রামটি ল-ভ- হয়। এ ঘটনা শুধু দেশে নয় বিদেশে আলোচিত হয়। এ ঘটনার পর নির্বাচিত সংসদ সদস্য রণজিত রায় অভিযোগ করেন, তার নির্বাচনী প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের প্রাক্তন হুইপ শেখ আব্দুল ওহাবের প্ররোচনায় এ ঘটনা ঘটেছে।

২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর চাপাতলার পাশেই সুন্দলী প্রাইমারি স্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় সাবেক হুইপ শেখ আব্দুল ওহাব বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে নৌকার বাইরে বের হতে না পারলে পরিনাম ভাল হবে না। নৌকা প্রতীক না পাওয়ায় সংখ্যালঘুরা যদি ভেবে থাকেন ওহাব আর আওয়ামী লীগে নেই, তার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেছে, তাহলে তারা ভুল করবেন।’ তিনি বলেন, ‘নৌকার প্রার্থী রণজিৎ রায় আপনাদের স্বজাতি হওয়ায় যদি ভাবেন তাকে ছাড়া আপনারা অন্য কাউকে ভোট দেবেন না তাহলে ভুল করবেন। ভোটের পরে এর জন্য আপনাদের খেসারত দিতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়দের উদ্দেশ্য করে হুইপ ওহাব বলেছিলেন, আপনারা সাম্প্রদায়িকতা থেকে বের হতে পারবেন না, আর আমার কাছে অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা আশা করবেন- সেটা হবে না।’
নির্বাচনের আগে ২ জানুয়ারি প্রচারণায় অধ্যক্ষ শেখ আব্দুল ওহাব চাপাতলা গ্রামে যান। তিনি মালোপাড়া মন্দিরের সামনের ফাঁকা জায়গায় নির্বাচনী মতবিনিময় সভা করেন। কিন্তু সেই সভায় মালোপাড়ার বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন অনুপস্থিত। ওহাবের নির্বাচনী কর্মীরা বহু চেষ্টা তদবির করেও তাদের সভায় হাজির করতে ব্যর্থ হন। এ নিয়ে মালোপাড়ার ভোটারদের প্রতি তিনি নাখোশ হন।

হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে এলাকার ৩৯ জনের নাম-ঠিকানা উলে¬খসহ ৩শ জনকে আসামি করে মামলা করে। মালোপাড়ার এ ঘটনার পর এলাকায় অভিযান চলে। অভিযান চলাকালে যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কর্মীরা উপজেলা জামায়াতের নেতা অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল আজিজ, ডা. সোহরাব হোসেন, আয়ুব আলী, চাপাতলা মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা ইউসুফ আলী, বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়া, মিজানুর রহমান, জামায়াত নেতা ও ইউপি সদস্য আবুল কাশেম মোল্লাসহ ১০-১২টি বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ভাঙচুর, লুটপাট ও অভিযানের সময় পুরুষশূন্য ওই এলাকায় মহিলারা চরম আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর ফেলে অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নেয়।

সহিংস ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ পুনরায় যে কোনো ধরনের হামলার আশঙ্কা রোধে চাপাতলার মালোপাড়ায় বসানো হয় একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। যেটি বর্তমানে স্থায়ী ফাঁড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে। এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে আটক দেখানো হয় শতাধিক ব্যক্তিকে। মামলাটি অভয়নগর থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাত ঘুরে তদন্তন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। হামলার বছরপূর্তির আগের দিন অর্থাৎ ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম ১০০ জনকে অভিযুক্ত করে যশোরের জেলা জজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০১৯ সালে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (১ম) আদালতে পাঠানো হয়। বর্তমানে সেখানেই মামলাটি বিচারাধীন। তবে মামলার চার্জ গঠনকালে ওই আদালতের তৎকালীন বিচারক আব্দুল হামিদ এজাহারনামীয় ছাড়া চার্জশিটে থাকা বাকি আসামিদের অব্যাহতি দেন। এ নিয়ে বাদী পক্ষ ২০২১ মার্চ মাসে হাইকোর্টে আপিল করেন।

২০১৬ সালে যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইঊনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা শাহিন রহমান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেড় শতাধিক হিন্দু পরিবার পৈত্রিক বাস্তুভিটা ও ফসলি জমি ফেলে রেখে সহায়সম্বল হীন হয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ছাত্র-যুব ঐক্য পরিষদ চৌগাছা উপজেলা শাখা। ২১ এপ্রিল চেয়ারম্যানের বিচার চেয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ছাত্র-যুব ঐক্য পরিষদ চৌগাছা পৌর শহরের ভাষ্কর্য মোড়ে মানববন্ধন শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট স্মারকলিপি প্রদান করে। ওই সময় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় নেতা রানাদাস গুপ্ত রানীয়ালী গ্রাম পরিদর্শন করেন।

পতিত আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ ধরনের হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ অহরহ সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়। এ সকল ঘটনার কোনটির বিচার পায়নি হিন্দু পরিবারগুলো। অথচ ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভাঙচুর, লুটপাটসহ নানা অভিযোগ তোলে হিন্দু সম্প্রদায়ের কতিপয় নেতা। তারা সভা সমাবেশ করে নির্যাতন বন্ধের দাবি জানায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে কোথাও কোনো অত্যাচার নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। তবে অত্যাচারের শিকার জনসাধারণ প্রতিশোধের সুযোগে দুএকজন অত্যাচারীর বাড়িঘরে হামলা চালায়। ওই হামলার কোনটিই ধর্মীয় বিবেচনায় হয়নি।

বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ঘটনাগুলো ঘটেছে। সে সময় আইন শৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, সরকার পতনের পর দুই দিনে ৬১টি অভিযোগ পাওয়া গেলেও ৫৭টির সত্যতা পাওয়া যায়নি।

বর্তমান পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের জাবীরের ( হোটেল জাবীর ইন্টারন্যাশনাল) ঘটনা না থাকলে যশোর শান্তির শহর হিসেবে পরিগণিত হতো। এখানকার সম্প্রীতি চমৎকার।