আওয়ামী লীগের একক আধিপত্যের দ্বাদশ সংসদের কার্যক্রম শুরু

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ নানা নতুনের এক সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে । মঙ্গলবার প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংসদের একক আধিপত্য রয়েছে আওয়ামী লীগের। নতুন কিসিমের এই সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টির চেয়ে সংসদে ছয় গুণ বেশি আসনে বসেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ৬২ আসনের স্বতন্ত্র এমপিদের অন্তত ৫৮ জনই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা। সংসদে দলীয় অংশগ্রহণও এবার কম। মাত্র ৫টি রাজনৈতিক দলের অংশীদারিত্ব আছে এই সংসদে। সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই স্বতন্ত্র এমপিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। সেখানে তাদের গঠনমূলক সমালোচনা করতে বলা হয়েছে সংসদে। এই এমপিরাও সংসদ নেতার উপর নিজেদের আস্থার কথা জানিয়েছেন। তাদের সংখ্যার বিপরীতে সংরক্ষিত আসনের এমপি মনোনয়নের দায়িত্বও তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর ছেড়ে দিয়েছেন।
এবারের সংসদকে অনেকে একপক্ষীয় হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের যুক্তি সরকারের দলীয় এমপিদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র এমপিরাও আওয়ামী লীগের নেতা। এর বাইরে জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেই নির্বাচন করে ১১ আসন পেয়েছে। এই আসনসহ ২৬টি আসনে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকের প্রার্থী দেয়নি। এ ছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও কল্যাণ পার্টি যে তিনটি আসন পেয়েছে এখানেও আওয়ামী লীগ ছাড় দিয়েছিল। তাই এসব এমপিদের নিয়ে যে সংসদ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে তাতে বিরোধী পক্ষ চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় সংসদের ভূমিকা কেমন হবে তা দেখতে সামনে অপেক্ষা করতে হবে।
গত ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২৩টি, জাতীয় পার্টি ১১টি, ওয়ার্কার্স পার্টি একটি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) একটি, কল্যাণ পার্টি একটি এবং স্বতন্ত্র সদস্যরা ৬২টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ জন স্বতন্ত্র এমপি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদধারী। এবারই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের থেকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের সংখ্যা প্রায় ছয়গুণ বেশি। অন্যদিকে সংরক্ষিত মহিলা আসনের ৫০ জনের মধ্যে ৪৮ জন হতে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে। দুজন সংসদ সদস্য হবেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কোটায়। সবমিলিয়ে ৩৫০ জন এমপি’র মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি’র সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৩২৯ জন। এজন্য বিশেষজ্ঞরা এটাকে ‘নতুন কিসিম’র সংসদ বলে অভিহিত করছেন। তাদের যুক্তি, সাধারণত সংসদে সরকারের পক্ষে ও বিপক্ষের বিষয় থাকে। কিন্তু এবারের সংসদে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদের একটি মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে সেখানে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। সরকারকে জনগণের পক্ষ নিয়ে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা। এই কাঠামো কার্যকরের অন্যতম শর্ত হচ্ছে সংসদে একটি কার্যকর বিরোধী দল থাকা। কিন্তু আমরা এবার যে সংসদ পেয়েছি সেখানে ক্ষমতাসীন দলের মোটামুটি একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। কাজেই এখানে প্রথাগত জবাবদিহিতামূলক যে সরকারের প্রত্যাশা সেটা নেই বললেই চলে। কাজেই এ প্রেক্ষিতে উদ্বেগটা থেকেই যাবে। তবে সংসদে যে একচ্ছত্র আধিপত্য থাকছে সেটা যদি জনস্বার্থের জন্য কাজ করে তাহলে ভালো কিছু আশা করা যেতেই পারে। তবে সেটা কতোটুকু হবে সেটা বলা মুশকিল। কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিন্তু সেটা নেই। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই সংসদের আরেকটি দুর্বলতা হচ্ছে এখানে ৬৭ শতাংশের বেশি ব্যবসায়ী। কাজেই এখানে আলোচনা বা বিতর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে বিশেষ পেশাজীবীদের প্রভাব থেকে যাবে। একসময় আমরা সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির কারণে সাফার করেছি। সেটা কাটিয়ে উঠে এখন আমরা যেটা পেয়েছি সেটা হলো বাস্তবে সংসদে কোনো বিরোধী দল নেই। তাই বাস্তবতার নিরিখে এই সংসদ থেকে খুব বেশি ইতিবাচক আশা করা কঠিন।[ মানবজমিন ৩০ জানুয়ারি]
এমন অবস্থার মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। বিকেল ৩টায় বসে সংসদের প্রথম অধিবেশন। অধিবেশনের প্রথম দিন টানা চতুর্থবারের মতো জাতীয় সংসদের স্পিকার পুনর্র্নিবাচিত হয়েছেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
একাদশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর সভাপতিত্বে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
অধিবেশনের শুরুতে ডেপুটি স্পিকার সবাইকে স্বাগত জানান। এরপর নতুন স্পিকার নির্বাচন করা হয়। সংসদে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পিকার হিসেবে শিরিন শারমিন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন। আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সম্পাদক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটন ওই প্রস্তাব সমর্থন করেন। স্পিকার হিসেবে অন্য কোনো মনোনয়ন ছিল না। পরে কণ্ঠভোটে স্পিকার নির্বাচিত হন।
এরপর সংসদ ২০ মিনিটের জন্য সংসদ মুলতবি করা হয়। এসময় সংসদ ভবনস্থ রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন স্পিকারের শপথ পড়ান।
স্পিকার নির্বাচনের সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরসহ সরকারি ও বিরোধী দলের প্রায় সব সংসদ সদস্য সংসদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
অধিবেশনের শুরুতে রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেন। তিনি বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। ষড়যন্ত্র করে কেউ যাতে জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কেউ যাতে আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করে মানুষের জানমাল ও জীবিকার ক্ষতিসাধন করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
এরপর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ মুলতবি ঘোষণা করেন। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত মুলতবি থাকবে।
অধিবেশনের শুরুর দিনই সংসদ নিয়ে নিজের উষ্মা প্রকাশ করলেন সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জি এম কাদের)। সংসদ সদস্যদের সংখ্যার বিচারে বর্তমান সংসদে ভারসাম্য রক্ষা হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জি এম কাদের বলেছেন, আসন সংখ্যার বিচারে এবার সংসদে শতকরা ৭৫ ভাগই সরকার দলের। স্বতন্ত্র ২১ ভাগ। তারাও অধিকাংশ সরকার দলীয়। মাত্র ৩ থেতে ৪ ভাগ শুধু বিরোধীদলীয় সদস্য।