সুন্দরবনের গহিনে হরিণ নিধন বেড়েছে

0

মনিরুল হায়দার ইকবাল, মোংলা (বাগেরহাট)॥ সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ঘটনা বেড়ে গেছে। এক শ্রেণির শিকারী সুন্দরবনের গহীনে প্রবেশ করে নানা কৌশলে হরিণ শিকার করে এর চামড়া ও মাংস বন সংলগ্ন লোকালয়সহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছে। এ ছাড়া বনের অভ্যন্তরে কাঁকড়া শিকারের টোপ বানাতেও এক শ্রেণির জেলে ব্যবহার করছে হরিণের মাংস। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থাসহ বনরক্ষীরা নিয়মিত টহল দিলেও অনেকটাই যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে হরিণ শিকারীরা।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় শিকারীরা নিয়মিত হরিণ শিকার করে আসছে। বনরক্ষিদের হাতে দু’চারটি হরিণ পাচারের ঘটনা ধরা পরলেও শিকারীরা আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে খুব সহজেই বেড়িয়ে আসছে। এমনও দেখা গেছে, হরিণ শিকার করে ধরা পড়ে কয়েকবার জেল খাটলেও আইনের মারপ্যাচে জেল থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় হরিণ শিকারে নেমে পড়ছে।
গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে এ চক্রের হাত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১০০ কেজি হরিনের মাংস, চারটি চামড়া, হরিণ ধরা ফাঁদ, ২০ রাউন্ড গুলি, একটি ট্রলার ও একটি নৌকা। বনরক্ষিরা এসব ঘটনায় ১০ শিকারীকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করেছেন ।
হরিণের মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও এক শ্রেণির মানুষের কাছে এ মাংস খুবই লোভনীয়। এ কারণে সারা বছর জুড়েই হরিণের মাংসের  রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। শীত মৌসুমে এ চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আর হরিণের মাংসের এ চাহিদাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হরিণ শিকারী চক্র নানা পন্থায় হরিণ শিকার করে মাংস বিক্রি করে থাকে। এ ছাড়া হরিণের চামড়ারও বেশ চাহিদা রয়েছে। এক শ্রেণির সৌখিন লোক হরিণের চামড়া শুকিয়ে শখের বশে তা তাদের সংগ্রহে রাখে। এসব কারণে হরিণ শিকারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মোংলায় জয়মনী, চিলা, বৈদ্যমারী, শরণখোলার সোনাতলা, পানিরঘাট, রাজাপুর, রসুলপুর, মোড়েলগঞ্জের জিউধরা, পাথরঘাটর চরদুয়ানী, জ্ঞানপাড়া, দাকোপের বানীশান্তা, ঢাংমারীসহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার শিকারীরা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পাস- পারমিট নিয়ে জেলে বেশে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হরিণ শিকার করে লোকালয়ে নিয়ে আসে। অনেক চোরা শিকারী আবার গোপনে সুন্দরবনে অনুপ্রবেশ করে হরিণ শিকার করে থাকে।
জেলে বেশে শিকারীরা গহীন সুন্দরবনের সুপতি, দুবলা, কটকা, কচিখালী, বাদামতলা, চান্দেশ্বর, টিয়ারচর, কোকিলমুনি, আন্ধারমানিকসহ গভীর বনের সুবিধাজনক স্থানে লাইলনের ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে থাকে। পরে ফাঁদে ধরা পড়া হরিণ জবাই করে এর মাংস ও চামড়া কৌশলে শিকারীরা মাছের পেটিতে বরফ দিয়ে সুবিধাজনক সময় লোকালয়ে পাচার করে থাকে। প্রতি কেজি হরিনের মাংস ৮ শ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী বাঁশতলা এলাকা থেকে একটি নৌকাসহ ২০ কেজি হরিণের মাংস ও ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। এ সময় ৪ শিকারী পালিয়ে যায়। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে সুন্দবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের তেরকাটি খাল থেকে বন রক্ষীরা ৩০ কেজি হরিণের মাংস পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। ২৭ জানুয়ারি দুবলার জামতলা ও আলোরকোল থেকে হরিণের মাংস ও ফাঁদসহ ৫ হরিণ শিকারীকে আটক করে বনরক্ষিরা। গত ২৫ জানুয়ারি সুন্দরবনের নীলকমল এলাকা থেকে ২০ কেজি হরিনের মাংস ও ২০ রাউন্ড গুলিসহ পাথরঘাটার হিরো আকন নামের এক শিকারীকে আটক করে বনরক্ষিরা। ২৩ জানুয়ারি শরণখোলার খুড়িয়াখালী গ্রামের তানজের আলীর বাড়ি থেকে দুটি হরিণের চামড়া উদ্ধার করে শরণখোলা স্টেশনের বনরক্ষিরা। ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সুদরবনের কচিখালীর ডিমের চর থেকে ১৫ কেজি হরিণের মাংস একটি ট্রলারসহ দুই শিকারীকে আটক করে কচিখালীর বনরক্ষিরা।
এছাড়া সুন্দরবনের অভ্যন্তরে কাঁকড়া শিকারের টোপ বানাতেও এক শ্রেণীর জেলে ব্যবহার করছে হরিণের মাংস। এসব জেলেরা বনে অবস্থানকালে কৌশলে হরিণ নিধন করে এর মাংস টোপ হিসেবে বড়শিতে গেথে কাঁকড়া শিকার করে থাকে। হরিণের মাংস মাধ্যমে নদী ও খালে বড়শি ফেললে বেশি কাঁকড়া শিকার করা যায় এমন ধারনা জেলেদের। তবে মোংলা, রামপাল ও সাতক্ষীরা এলাকার কাঁকড়া ধরার জেলেরা টোপ বানাতে গিয়ে বেশি করে নিয়মিত হরিণ শিকার করছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মোংলার সমন্বয়কারী শেখ নুর আলম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের হরিণ শিকারী চক্র। বনসংলগ্ন এলাকার লোকজনই হরিণ শিকারের সাথে বেশি জড়িত। এরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় হরিণ শিকার করে থাকে। বনের জীববৈচিত্র রক্ষায় বনরক্ষিসহ অন্যান্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আরও সচেতন হতে হবে। সচেতন হতে হবে জনসাধারণকেও।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) বেলায়েত হোসেন জানান, নিয়মিত টহলে কারণে শিকারীরা আটক হচ্ছে। তার পরও হরিণ শিকারীদের ধরতে বন বিভাগ টহল ব্যবস্থা আরো জোরদার করেছে।